মস্তিষ্কে চিপ লাগানো নিয়ে হারুনের কাল্পনিক গল্প

কক্সবাজারে হারুনুর রশিদ নামে এক লোক দাবী করেছে, তার ব্রেইনে চিপ লাগিয়ে তার ব্রেইন হ্যাক করা হয়েছে এবং হ্যাকাররা তার মাথার সব ডেটা/স্মৃতি মুছে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। Jugantor.com

কারুর ব্রেইনে কোন চিপ লাগানোর কয়েকটা সমস্যা আছে। কয়েকটা প্রশ্ন দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক।

১। আদতেও কি এই ধরনের কোন চিপ আছে? থাকলে বাংলাদেশের হ্যাকারদের হাতে এই চিপ কীভাবে এলো, যেখানে সিআইএ এখনো মানুষকে টর্চার করে কথা বের করার জন্য?

২। ব্রেইনে চিপ বসাথে খুলি ছিদ্র করা লাগবে। এই ধরনের অপারেশন প্রায়ই হয়, এমনকি বাংলাদেশেও। আজব ব্যপার হচ্ছে, কয়েক হাজার বছর আগের কংকালেও এটার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু হাড় ছিদ্র করা আর চিপ বসানোর মধ্যে বিশাল, বিশাল তফাত আছে।

৩। চিপ ব্রেইনের নিউরনের সাথে সংযুক্ত করা লাগবে। এটা কিছু খুব বিরল ক্ষেত্রে হয়েছে, কিন্তু সেটা হলে সাড়া জাগানো খবর হয় সেটা। অন্ধ মানুষকে চোখে দেখানোর এই ধরনের একটা প্রচেষ্টা অনেক দিন থেকে চলছে। এই কাজে পৃথিবীর সেরা কিছু নিউরোসায়েন্টিস্ট, নিউরোসার্জন আর বিজ্ঞানীরা জড়িত। এই মহিরথীরাও এখনো প্রাথমিক সফলতার বেশী কিছু করতে পারে নাই।

৪। হারুনুর রশিদের ধারনা, কে বা কারা তাকে ইনজেকশন দিকে অথবা চায়ের সাথে ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে তার ব্রেইনে চিপটা লাগিয়েছে। যাক, এখন থেকে আর ব্রেইন টিউমার অপারেশনের জন্য চেন্নাই যাওয়া লাগবে না বাংলাদেশের মানুষের, হারুরনুর রশিদের শ্যালিকা আসমা উল হোসনা-র সাথে যোগাযোগ করলেই চলবে।

৫। ‘এ ঘটনার পরদিন আমি একজন খুব পরিচিত কণ্ঠের গায়েবি আওয়াজ শুনতে পাই। সেখানে আমাকে গালাগাল করা হচ্ছিল। ‘
ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারের ক্লাসিক লক্ষণ। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার বা সংক্ষেপে ডিআইডি: এটাকে আগে মাল্টিপল পার্সনালিটি ডিজঅর্ডার বলা হতো। এই মানসিক রোগ হলে একই মানুষের ব্রেইনে একাধিক সত্তা থাকে। মাঝে মাঝে তারা একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে, মাঝে মাঝে পারে না। সিনেমাতে দেখানো হয়, একটা সত্তা রাতে খুন করে এসেছে, আরেকটা জানেই না। অথবা একটা সত্তার চিন্তা আরেকটা সত্তার কাছে ভুতুড়ে শব্দ বলে মনে হয় । বিস্তারিত পড়তে চাইলে:  healthyplace.com, psychiatry.org

৬। ‘ইতোমধ্যেই আমার ফেসবুক এলোমেলো হয়ে যায়। ব্যবহৃত আইফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবজিসহ ৫টি গেমস ডাউনলোড হয়ে যায়। কয়েক দফায় আমার ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গায়েব হয়ে যায়।‘

– এগুলি সাধারণ হ্যাকিং-এ হতে পারে। তার সাথে ব্রেইন হ্যাকিং এর সম্পর্ক বুঝলাম না। হারুনুর রশিদ বলেছেন, তিনি একজন আইটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছেন এবং নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে তার অ্যাপল আইডি হ্যাক হয়েছে। যদিও হ্যাকাররা পাঁচটা গেইম কেন ইন্সটল করবে বুঝলাম না। কিন্তু এটাকে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়—সে নিজেই ইন্সটল করেছে কিন্তু ভুলে গিয়েছে। ব্যাংকের টাকাও একই ব্যাপার (যদি এগুলি সত্যি হয়ে থাকে)

৭। পুলিশের একজন এস আই কে উদ্ধৃত করে যুগান্তর বলছে, “তবে ভিকটিমের মাথায় যেহেতু এখন চিপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে; তাই ভিকটিম চাইলে মামলাটি আবার পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন।“
– এস আই যদি আসলেই এই কথা বলে থাকেন, তাহলে তার মাথা স্ক্যান করা দরকার। আর না বলে থাকলে সাংবাদিকের।

৮। যুগান্তর লিখেছে, “যেভাবে মানব মস্তিষ্কে হানা দেয় হ্যাকাররা : মানুষের মস্তিষ্ক হ্যাক করে গোপন তথ্য চুরি করা যে সম্ভব, তার প্রমাণ আগেই দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীরা। তারা ২০১২ সালের শুরুর দিকে স্বল্পমূল্যের ইমোটিভ ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস বা ইমোটিভ বিসিআই ব্যবহার করে মানুষের ব্রেইন হ্যাক করতে সক্ষম হন। গবেষণায় সহযোগিতা করা স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েকজনকে ইমোটিভ বিসিআই হেডসেট পরিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে দেন বিজ্ঞানীরা।

এরপর মস্তিষ্কের পি-৩০০ সিগন্যাল অনুসরণ করে সংগ্রহ করেন স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন গোপন তথ্য।“ –একদম বোগাস, মিথ্যা কথা। এটা এখনো একদম শিশু-কালের বিজ্ঞান, এমন কিছুর ধারেকাছেও যায় নাই। স্ট্রোক ভিকটিম বা প্যারালাইজড রোগীর নড়াচড়া করার জন্য ব্রেইনওয়েভ পড়ার যন্ত্র এটা এবং এটা মাথার বাইরে বসানো হয়, ভেতরে না। (যুগান্তর সম্ভবত এই আর্টিকেল থেকে কিছু তথ্য নিয়েছে dailymail.co.uk

কিন্তু সেটাকে পুরাপুরি বিকৃত করে উপস্থাপন করেছে।

The scientists took an off-the-shelf Emotiv brain-computer interface, a device that costs around $299, which allows users to interact with their computers by thought, and is often used to control games.

The scientists then sat their subjects in front of a computer screen and showed them images of banks, people, and PIN numbers.
They then tracked the readings coming off of the brain, specifically a signal known as P300.

বিজ্ঞানীরা মানুষকে বিভিন্ন পিন নাম্বার দেখিয়েছেন, এবং তাদের ব্রেইনের কাজের পরিমাপ করেছেন। নিজের পিন স্ক্রিনে দেখলে “চেনা পিন” অনুভূতি আলাদা করে এই সেন্সরে ধরা পড়েছে। তার মানে এই না যে এটা কারুর মাথাতে লাগিয়ে তার স্মৃতি থেকে পিন বের করে আনা যাবে।

In the paper that the scientists released, they state that ‘the P300 can be used as a discriminative feature in detecting whether or not the relevant information is stored in the subject’s memory.

অর্থটা খুব সহজ—এটা দিয়ে কারুর স্মৃতিতে কিছু জমা আছে কি নাই, সেটা বের করা যেতে পারে। কিন্তু তার মানে আগে জানা থাকা লাগবে ঠিক কী তথ্য খোজা হচ্ছে, সেই তথ্যটাই জানা থাকা লাগবে। এটা অপরাধীদের জেরা করার জন্য কাজে লাগতে পারে। পিন যদি জানাই থাকে, তাহলে হ্যাকাররা এতো ঝামেলা করতে যাবে কেন?

৯। শেষ করি একজন নিউরো সার্জনের মন্তব্য দিয়ে। বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞরা সরাসরি মতামত দিতে কেন জানি ভয় পান। সেখানে এনার কথা বেশ ভাল লেগেছে

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ শামশুল ইসলাম খান বলেন, ‘ব্রেইন হ্যাকের বিষয়টি অবিশ্বাস্য এবং হলিউড-বলিউডের মুভির কোনো গল্পের মতোই মনে হচ্ছে।’
আমি সম্পূর্ন একমত।

হারুনুর রশিদের মানসিক চিকিৎসা দরকার। আশা করি তার আত্মীয়রা সেটার ব্যবস্থা করবেন।
ছবি Source

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *