লিঙ্গীয় পরিচয়, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স, লিঙ্গীয় রাজনীতি

যারা আমাকে খুব ভালো করে চেনেন, তারা জানেন আমি একটা ইউটিউব চ্যানেল ‘Philosophy Tube’ এর একজন মুগ্ধ অডিয়েন্স। এই চ্যানেলের যে স্রষ্টা, যাকে ‘অলি’ নামে ডাকা হতো, তাকে প্রায় দুই বছরের উপর নিয়মিত দেখতে দেখতে কেমন যেন আপনজন টাইপের মানুষ মনে হতো আমার। তো আমার এই খুব পরিচিত মানুষটা খুব সম্প্রতি ‘ট্রান্সজেন্ডার নারী’ হিসাবে নিজেকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি পুরুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করলেও, নিজেকে তিনি নারী হিসাবে ভাবতে ‘আরাম ও আপন’ বোধ করতেন।

তাই এখন থেকে লিগ্যালি এবং কাগজপত্রে (Driver Licence, Passport, Social Security, Voter Id) তে তার সেক্স লেখা থাকবে ‘Female’. He এর বদলে আমরা তাকে ‘She’ দিয়ে রেফার করব। ‘অলি’ এর বদলে তার নাম এখন ‘এবিগাইল’ বা এবি।

এই ঘটনাটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে গত কয়েকদিনে। চিন্তা করতে শুরু করেছি, আমার জেন্ডার আইডেন্টিটি আসলে কি? নারী হিসাবে আমি জন্ম নিলেও আমি কি আসলেই নারী? হাজার রকম চিন্তায় আমি প্রায় সারাক্ষণ মগ্ন থাকি।

যেহেতু আমি ‘ট্রান্সজেন্ডার’ এর ব্যাপারে খুবই কম জানতাম, সেহেতু নিজের ভাবনায় জ্বালানি দিতে পড়াশোনাও করতে হলো। সেখান থেকেই কয়েকটা বিষয় শেয়ার করতে ইচ্ছা হলো।

১। ট্রান্সজেন্ডার কি?

খুব সহজ করে বললে, মানুষ অনেক সময় ভুল শরীরে জন্মগ্রহণ করে। আপনার প্রজনন অঙ্গ পুরুষের কিন্তু আপনার সম্পর্কে আপনার জ্ঞান সবচেয়ে বেশি থাকায়, আপনি খুব ভালো করে জানেন, আপনি একজন ‘নারী’৷ তাহলে আপনার পরিচয়, আপনি একজন ‘ট্রান্সজেন্ডার নারী’। ঠিক এরকম ভাবে উল্টোটাও হতে পারে।

২। আমি ট্রান্সজেন্ডার সেটা বোঝার পর কি আমাকে ‘সেক্স চেইঞ্জ’ অপরেশন করতে হবে?

একেবারেই আবশ্যিক না। সেক্স চেইঞ্জ অপারেশন থেকে শুরু করে, পোষাক পরিবর্তন, কাগজপত্রে নিজের আইডেন্টিটি পরিবর্তন সব কিছুই আপনার ‘মর্জি’ এর উপর নির্ভর করছে। আপনি চাইলে এর সবগুলোই করতে পারেন, বা চাইলে কিছুই করতে পারেন না।

আপনি ট্রান্সজেন্ডার হলেই আপনার শারীরিক গঠনে এটা বুঝিয়ে দেওয়া আবশ্যকীয় নয় (বাংলাদেশ বা কোনো মুসলিম দেশের পারসপেকটিভে এই কথা বলা হচ্ছে না। যে দেশগুলো ট্রান্সজেন্ডারদের সমঅধিকারে বিশ্বাস করে তাদের পারসপেকটিভে এই কথাগুলো।)

৩। একজন ট্রান্সজেন্ডার তার সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি আবিষ্কার করার পর, তার সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন কেমন হবে?

এটাও সম্পূর্ণ তার মর্জির উপর। একজন ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ(যে জন্ম নিয়েছে নারী হিসাবে, কিন্তু এখন নয়) নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। সেক্ষেত্রে তার পরিচয় হবে ‘স্ট্রেইট ট্রান্সজেন্ডার মেইল’। সে চাইলে পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। তখন তার পরিচয় হবে, ‘গে ট্রান্সসেক্সুয়াল মেইল’। অর্থাৎ জন্মের সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকলে, সে যদি পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হতো, সে হতো হোমোসেক্সুয়াল। কিন্তু এখন তার উলটো। যেহেতু সে নিজেকে নারী বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

৪। নারী ও পুরুষের জৈবিক ব্যাপারগুলো কি উলটে যাবে ট্রান্সজেন্ডার হলে?

না। একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী (যে জন্মের সময় পুরুষ ছিলেন) পিরিয়ড ফেস করবে না, প্রেগনেন্ট হবেন না৷ তেমনি ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ (যে জন্মের সময় নারী ছিলেন) ইজাকুলেশন করতে পারবেন না।

৫। তাইলে ট্রান্সজেন্ডার হয়ে লাভটা কি? (৪ নাম্বার প্রশ্নের আলোকে)

আমার বন্ধু এবিগাইলের ভাষায় বলি। যতদিন পর্যন্ত সে পুরুষ হয়ে ছিল, তার মনে হতো খুবই জঘন্য একটা চাকরিতে সে আটকে আছে। সে সময় টায়ার্ড ফিল করত, কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারত না। সবসময় তীব্র উদ্বিগ্নতায় ভুগত। মনে হতো, তার কিছু একটা নাই, কিন্তু থাকা দরকার। যে জবটার জন্য আরো অনেক মানুষ হয়তো প্রাণ দিবে, সেই জবটাতেই তার দমবদ্ধ লাগত। সে সুইসাইড এটেম্পট নিয়েছিল। সে বুঝত, তার কেন এমন লাগে। জাস্ট সাহস হচ্ছিল না কোনো স্টেপ্স নিতে (ভাবতে পারেন, একজন ইংল্যান্ডবাসী সাদা পুরুষ সাহস পাচ্ছিল না!) কিন্তু যেই মুহূর্তে সে ঘোষণা দিল সে একজন নারী, সেই মুহূর্তে…. তার কোট দেই এখানে “Now When I see my self in the mirror, what do I see? A male or A female?? I see a happy person.” 😀

৬। আমরা এদেশে যাদের ‘হিজরা’ ডাকি, তারা কি ট্রান্সজেন্ডার?

বেশিরভাগই নন । তাদের বলা হয় ‘Intersex’। ট্রান্সজেন্ডাররা জন্মের সময় নারী বা পুরুষ হিসাবে জন্ম নেন, কিন্তু পরবর্তী সেটা অস্বীকার করে। Intersex মানুষদের জন্মের সময় ‘সাধারণত’ বোঝা যায় না তারা নারী না কি পুরুষ। কারণ তাদের রিপ্রোডাকশন পার্ট সচরাচর ধরনের নয়। (ইন্টারসেক্সদের নিয়ে এই লেখা নয়। তাই বিস্তারিতে যাচ্ছি না)। তবে এটুকু বলে রাখি, একজন ইন্টারসেক্স মানুষ ট্রান্সজেন্ডার হতে পারেন। তাকে ‘পুরুষ’ পরিচয়ে তার পরিবার বড় করতে থাকলেও, তিনি নিজেকে পরবর্তীতে ‘নারী’ স্বীকৃতি দিতে পারেন।

৭। ট্রান্সজেন্ডারদের কি থেরাপি দিয়ে (আমাদের দেশে মাইর) ‘লাইনে আনা’ যায়?

চেষ্টা করা হয়েছিল আগে ইউএসএ তে। যখন ওখানকার মানুষের জেন্ডার আইডেনটিটি নিয়ে ধারণা ছিল আমাদের দেশের মানুষের পর্যায়ের৷ কিন্তু দেখা গেছে, এতে মারাত্মক হিতে বিপরীত হয়। জন্মের সময় যে সেক্স নিয়ে মানুষ জন্মায়, তার সাথে মানিয়ে নেওয়াই যেখানে সবচেয়ে সহজ উপায়, সেখানে কিছু মানুষ চেষ্টা করেও এই উপায়ের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না। অর্থাৎ তাদের ভেতর থেকে কোনো একটা ধাক্কা আছে। এই অভ্যন্তরীণ ধাক্কাকে থেরাপি দিয়ে ঠিক করতে গেলে দেখা গেছে ‘রোগি’ মারাত্মক ডিপ্রেশন, এক্সাইটি এটাকে ভুগছে। এমনকি সুইসাইডালও হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে এই চিন্তা পাল্টালো।এখন ফিলোসফি হচ্ছে, “একজন মানুষ অন্যের কোনো ক্ষতি না করে, নিজেকে যা ইচ্ছা সেই সেক্স এর দাবি করতে পারে। আমরা তাকে বাঁধা দেওয়ার কে! আমাদের তো নারী-পুরুষের প্রতি ‘বৈষম্যমূলক’ কোনো আইন নেই, যে আইনগুলোর ক্ল্যাশ লাগবে তার আইডেনটিটি নিয়ে। So, all is well.”

৮। আমাদের দেশে অনেক নারী ছেলেদের মতো পোশাক পরেন, ছোট চুল রাখেন। বাইরের দেশে অনেক ছেলে নারীদের পোশাক পরেন। এরা কি ট্রান্সজেন্ডার?

যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষ না বলছেন, তিনি ‘ট্রান্সজেন্ডার’, ততক্ষণ তিনি ট্রান্সজেন্ডার নন। কারণ এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ নিজের অনুধাবনের ব্যাপার। যেসব নারীরা তথাকথিত পুরুষের এপিয়ারেন্স ধারণ করেন, বুঝবেন যে, তারা সমাজের বলে দেয়া এবং নারী-পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া ‘পোশাক-গঠন-রূপ-প্রকাশভঙ্গি’ এইসব মেনে নিতে রাজি নন। এরূপ পুরুষের জন্যও একই কথা।

**আজকের মতো এই পর্যন্তই। আমার একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষের সাথে কথা বলার ইচ্ছা। তার এদেশীয় অভিজ্ঞতা শোনার ইচ্ছা। কেউ পড়ে থাকলে, হাতে সময় থাকলে একবার যোগাযোগ করবেন প্লিজ?

লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *