চাঁদে অবতরণ নিয়ে যত প্রোপাগান্ডা

১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে প্রথম চাঁদে গিয়ে যখন নেমেছিলেন মার্কিন নভোচারীরা, সেই ঘটনা বিশ্বজুড়ে দেখেছেন কোটি কোটি মানুষ।

কিন্তু পৃথিবীতে এখনো এমন বহু মানুষ আছেন, যারা বিশ্বাস করেন, মানুষ আসলে কোনদিন চাঁদে যায়নি।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে জরিপ চালিয়েছে।

তাদের জরিপে সব সময় দেখা গেছে, চাঁদে মানুষ যাওয়ার ব্যাপারটিকে সাজানো ঘটনা বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ শতাংশ মানুষ।

এদের সংখ্যা হয়তো কম, কিন্তু চাঁদে যাওয়ার ব্যাপারে অবিশ্বাস ছড়ানোর জন্য যড়যন্ত্র তত্ত্ব জিইয়ে রাখতে সেটিই যথেষ্ট।

তাছাড়া অপবিজ্ঞানে ভরপুর আমাদের উপমহাদেশে এসব ষড়যন্ত্রতত্ব একটু বেশিই পালে হাওয়া পায়। এটা অবাক হওয়ার বিষয় নয়।

কিন্তু যারা নিজেদের বিজ্ঞানমনস্ক মনে করে তাদের কাছে এমনটা আশা করা যায় না।

আবার এসব সস্তা জনপ্রিয়তায় মানুষ দ্রুত পা দেয়। যাই হোক, আমি এবার নিচে কিছু চাঁদে যাওয়া নিয়ে অযৌক্তিক প্রপাগান্ডার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেখি।

বিল কেসিং

চাঁদের অভিযান যে সাজানো ঘটনা, এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রথম প্রচার করেন তিনি।

চাঁদে মানুষ যাওয়ার ব্যপারটিকে পুরোপুরি ধাপ্পাবাজি মনে করেন যারা, তারা এর সপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেন।

এরা মনে করেন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র সেরকম প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ তখনো ছিল না, যেটি সফল অভিযানের জন্য দরকার ছিল।

এই যুক্তি দিয়ে এরা বলে থাকেন, নাসা তাদের অভিযান যে সফল হবে না, সেটা বুঝে ফেলেছিল।

কাজেই তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহাকাশ অভিযানে টেক্কা দেয়ার জন্য হয়তো চাঁদে সফল অভিযান চালানোর নাটক সাজিয়েছে।

কারণ মহাকাশ অভিযানে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে ছিল, এমনকি তারা চাঁদের বুকে একটি যান ক্র্যাশ ল্যান্ড করিয়েছিল।

চাঁদের বাতাসহীন পরিমন্ডলে পতাকা উড়লো কীভাবে?

নীল আর্মস্ট্রং আর অলড্রিনের পুঁতে আসা পতাকাটি কুঁকড়ে আছে।কিছু ছবি দিয়ে তারা এই উদাহারণটি দেয়ার চেষ্টা করেন।

তাদের প্রশ্ন, চাঁদে তো বাতাস নেই, তাহলে সেখানে মার্কিন পতাকা উড়লো কেমন করে। তাদের আরও প্রশ্ন,

“কেন এই ছবিতে চাঁদের আকাশে কোন তারামন্ডল দেখা যাচ্ছে না?”

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে নাকচ করে দেয়ার মতো অনেক বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে, বলছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মাইকেল রিক।

তিনি বলেন, ”

নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন যখন পতাকাটি খুঁটি দিয়ে চাঁদের মাটিতে লাগাচ্ছিলেন, তখন সেটি কুঁচকে গিয়েছিল। আর যেহেতু পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছয় গুণ কম, তাই কুঁচকানো পতাকাটি সেরকমই থেকে গিয়েছিল।”

চাঁদের আকাশে কেন তারা নেই?

চাঁদে যাওয়ার কথা যারা অস্বীকার করেন, তারা প্রমাণ হিসেবে এই বিষয়টির কথা উল্লেখ করেন।

তাদের প্রশ্ন, কেন চাঁদে নামার এই ছবির পেছনের আকাশে কোন নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে না।

বাস্তবে আসলে এই ছবিতে উজ্জ্বল আলো এবং অন্ধকারের একটা বিরাট পার্থক্যই চোখে পড়ে।

এটা কেন? রচেস্টার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অ্যাস্ট্রো ফিজিক্সের অধ্যাপক ব্রায়ান কোবারলিন বলেন, এর কারণ,

চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়।

সে কারণে ছবিতে এত উজ্জ্বলতা চোখে পড়ছে। আর এই উজ্জল আলোর কারণেই পেছনের আকাশের তারকার আলো ম্লান হয়ে গেছে।

এ কারণেই অ্যাপোলো ১১ মিশনের ছবিতে চাঁদের আকাশে কোন তারা দেখা যায় না।

কারণ এসব তারার আলো খুবই দুর্বল। আর ক্যামেরার এক্সপোজার ছিল অনেক বেশি।

নকল পায়ের ছাপ

নীল আর্মস্ট্রং এর বুটের ছাপ। চাঁদে যেহেতু বাতাস নেই, তাই এই ছাপ থেকে যাবে লাখ লাখ বছর।

নভোচারীরা চাঁদের বুকে যে পায়ের ছাপ রেখে এসেছিলেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এ নিয়ে সন্দেহপোষণকারীরা।

তাদের কথা হচ্ছে, চাঁদে কোন আর্দ্রতা নেই। কাজেই বাজ অলড্রিনরা সেখানে যে পায়ের ছাপ রেখে এসেছেন, সেগুলো হওয়ারই কথা নয়।

এর প্রত্যুত্তরে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক রবিনসন।

“চাঁদের মাটি এক ধরণের পাথর আর ধূলায় ঢাকা, যার নাম ‘রেগোলিথ।’

এই স্তরটি খুবই ফাঁপা, এবং পা রাখলেই তা ডেবে যায়।

আর মাটির কণাগুলো যেহেতু একটার সঙ্গে একটা লেগে থাকে, তাই জুতোর ছাপ পড়ার পর সেটি সেভাবেই থেকে যায়।”

মার্ক রবিনসন বলেন,

“চাঁদের বুকে নভোচারীদের এই পায়ের ছাপ থেকে যাবে লক্ষ লক্ষ বছর, কারণ সেখানে যেহেতু কোন বায়ুমন্ডল নেই, তাই কোন বাতাসও নেই।”

তেজস্ক্রিয়তায় নভোচারীরা মারা যাওয়ার কথা

আরেকটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হচ্ছে, পৃথিবীকে ঘিরে যে তেজস্ক্রিয়তার পরিমন্ডল, সেটিতে নভোচারীদের মারা যাওয়ার কথা। তারা কীভাবে চাঁদে যেতে পারে?

পৃথিবীকে ঘিরে এই তেজস্ক্রিয় অঞ্চলটিকে বলে ‘ভ্যান অ্যালেন বেল্ট’ এবং সৌর ঝড় আর পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্রের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় এই তেজস্ক্রিয়তার সৃষ্টি হয়।

মহাকাশ অভিযান নিয়ে যখন প্রতিযোগিতা শুরু হলো, তখন এই বিকীরণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল।

তাদের আশংকা ছিল মানুষ মারাত্মক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার শিকার হতে পারে।

তবে নাসার বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যাপোলো-১১ এর ক্রু যারা ছিলেন, চাঁদে যাওয়ার সময় তারা ভ্যান অ্যালেন বেল্টে ছিলেন মাত্র দুই ঘন্টা।

আর এই বেল্টের যে অঞ্চলটিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সবচেয়ে বেশি, সেখানে তারা অবস্থান করেন পাঁচ মিনিটেরও কম।

ফলে তাদের ওপর তেজস্ক্রিয়তার সেরকম প্রভাব একেবারেই পড়েনি।

চাঁদে পরবর্তীকালে যেসব নভোযান পাঠানো হয়েছে সেগুলো থেকে অ্যাপোলোর ল্যান্ডিং সাইটের অনেক ছবি তোলা হয়েছে।

নাসা সেসব ছবি প্রকাশও করেছে। ২০০৯ সাল থেকে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছে এরকম একটি নভোযান।

সেটি থেকে তোলা ছবি স্পষ্টই প্রমাণ করে যে চাঁদে আসলেই মানুষ নেমেছিল।

অ্যাপোলো-১১ যেখানটায় নেমেছিল, ঠিক সেখানকার কিছু ছবিতে ঐ অভিযানের অনেক প্রমাণ চোখে পড়ছে।

মাটির ওপর ছাপ তো আছেই, আরও আছে লুনার মডিউলের পড়ে থাকা অংশ।

শুধু তাই নয়, ছয় জন মার্কিন নভোচারী চাঁদে যে মার্কিন পতাকা গেড়ে এসেছিলেন, সেগুলো এখনো আছে। সেই পতাকার ছায়াও ধরা পড়েছে ছবিতে।

তবে একটি পতাকা আগের জায়গায় নেই। বাজ অলড্রিন জানিয়েছেন, তাদের লুনার মডিউল যখন ফিরে আসার জন্য চাঁদের বুক থেকে উঠছিল, তখন ইঞ্জিনের নির্গত ধোঁয়ায় সেটি পড়ে যায়।

যদি মার্কিনীরা সত্যিই চাঁদে না গিয়ে থাকে, তাহলে সোভিয়েতরা কেন এরকম একটি সাজানো ঘটনায় বিশ্বাস করবে?

চাঁদে মানুষের সফল অভিযান সম্পর্কে যারা নানা রকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ান, তাদেরকে একটা প্রশ্ন সব সময় করা হয়।

তা হলো, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তীব স্নায়ু যুদ্ধ আর চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে তারা কেন মার্কিনীদের সাজানো ঘটনা মেনে নেবে।

নাসার সাবেক এক ইতিহাসবিদ রবার্ট লনিয়াস বলেন, “আমরা যদি চাঁদে না গিয়ে থাকি এবং এরকম নাটক সাজিয়ে থাকি, তাহলে সোভিয়েতদের তো সেটা ফাঁস করে দেয়ার সক্ষমতা এবং ইচ্ছে দুটিই ছিল।”

“কিন্ত তারা তো একটি শব্দও বলেনি এনিয়ে। সেটাইতো এর পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”

Writter:RAWSAF IMAM

Invest in Social
Pritom Majumder

Pritom Majumder

A lil creation of the UNIVERSE

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *