চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল ২০২০

রক্তবাহিত হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কারের জন্য ২০২০ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন দুই মার্কিন বিজ্ঞানী হার্ভে জে অল্টার, চার্লস এম. রাইস এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল হটন। হেপাটাইসিস সি ভাইরাস বিশ্বব্যাপী সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের জন্য দায়ী। হেপাটাইসিস সি নিয়ে এই বিজ্ঞানীরা কাজ করার আগেই হেপাটাইসিস এ এবং হেপাটাইসিস বি আবিষ্কৃত হয়েছিল।

হেপাটাইসিস এ ও বি এর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু অধিকাংশ রোগী ভিন্ন ধরনের রক্তবাহিত হেপাটাইটিসের আক্রান্ত হতেন। এই হেপাটাইটিসের প্রকৃত কারণ অজানা ছিল। সেই অজানা হেপাটাইটিস নিয়েই কাজ করেছেন এই তিন বিজ্ঞানী। শুধু কাজই করেননি বরং সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরা এর নাম দেন হেপাটাইটিস সি। ফলে এখন এর ঔষধও তৈরি করা যাবে।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস কতটা ক্ষতিকর? একটা সমীক্ষা দেখা যাক। প্রতিবছর এই ভাইরাসে বিশ্বব্যাপী আক্রান্ত হয় সাত কোটি মানুষ। এর মধ্যে মারা যায় প্রায় ৪ থেকে ১০ লাক্ষ মানুষ। ভাইরসাটি ভয়ংকরই বটে।

হেপাটাইটিস- বিশ্বব্যাপী মানবজাতির জন্য হুমকি

১৯৪০ এর দশকে বিশ্বব্যাপী দুটি হেপাটাইটিস ভাইরাস পরিচিত হয়ে ওঠে। হেপাটাইটিস এ ও হেপাটাইটিস বি। প্রথমটি অর্থাৎ হেপাটাইটিস এ দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। ফলে রোগীর ওপর দীর্ঘ্যমেয়াদী প্রভাব পড়ে। অন্যটি হেপাটাইটিস বি রক্তের ম্যাধ্যমে সংক্রমিত হয়।

ফলে হেপাটাইটিস বি এর কারণে সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবণা থাকে প্রবল। তাই হেপাটাইটিস এ এর তুলনায় হেপাটাইটিস বি মানবজাতির জন্য বেশি ক্ষতিকর।

কথায় আছে, যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শত্রুর মতিগতি বুঝতে হয়। সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রথমে শত্রুকে চিহ্নিত করতে হবে। ১৯৬০ এর দশকে সেই কাজটি প্রথম করেন মার্কিন বিজ্ঞানী বারুচ ব্লুমবার্গ। তিনিই প্রথম হেপাটাইটিস বি সনাক্ত করেন।

ভাইরাল হেপাটাইটিস

পরে এর কার্যকারী ভ্যাকসিনও তৈরি হয়। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কারের স্বীকৃত স্বরুপ ব্লুমবার্গকে ১৯৭৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়েছিল।

মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ ইনস্টিটিউটের গবেষক হার্ভে জে অল্টার (২০২০ নোবেল জয়ী) হেপাটাইটিস রোগীদের রক্ত নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখলেন, কিছু হেপাটাইটিস রোগীদের রক্তে হেপাটাইটিস এ বা হেপাটাইটিস বি কোনোটাই নেই। ফলে অবাক হন অল্টার ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা আরো অবাক হন এটা দেখে যে, ঐ সমস্ত রোগীর রক্তে এক অজানা ভাইরাস আক্রমন করেছে।

যা শুধু মানুষের শরীরে সংবেদনশীল। অল্টার এই ভাইরাসের ব্যাপারে গবেষণা করতে থাকেন। অবশেষে তিনি সিধান্তে পৌছান, রোগীদের রক্তে পাওয়া ভাইরাসটি একটি নতুন ভাইরাস। তিনি এর নাম দেন ‘নন এ নন বি’ হেপাটাইটিস।

এরপর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকে হটন (২০২০ নোবেল জয়ী) ‘নন এ নন বি’ হেপাটাইটিসের জিনোম পৃথক করেন। তিনি এর নাম দেন হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। ভাইরাসটি কি নিজেই নিজেকে হেপাটাইটিসে পরিণত করতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এগিয়ে আসেন আরেক মার্কিন গবেষক চার্লস এম. রাইস (২০২০ নোবেল জয়ী)।

তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের তথ্য

হেপাটাইটিস সি ভাইরাসটি আবিষ্কার হয়েছিল ১১ বছর আগে। এবছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল দিয়ে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাঁদের এই আবিষ্কারের জন্য ধন্যবাদ। কেননা এখন সহজেই হেপাটাইটিস সি ভাইরাস নির্মুল করা যাবে। শত্রু যেহেতু ধরা পড়েছে, শত্রু নিধন নিশ্চই করা সম্ভব হবে।

 

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

হার্ভে জে অল্টার ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রচেস্টার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল ডিগ্রি অর্জন করেন। স্ট্রং মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং সিয়াটল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ ইনস্টিটিউটে সহকারী চিকিৎসক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে সিনিয়র তদন্তকারী হিসাবে ক্লিনিকাল সেন্টারের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগে যোগ দেন।

হার্ভে জে অল্টার

মাইকেল হটন যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে লন্ডনের কিং কলেজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে ক্যালির্ফোনিয়ার চিরন কর্পোরেশনে যোক দেন। ২০১০ সালে আলবার্টা বিশ্ববদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হন। বর্তমানে কানাডায় অ্যাপ্লাইড ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে রয়েছেন।

মাইকেল হটন

চার্লস এম রাইস ১৯৫২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ২০০১ সাল পর্যন্ত রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক ও নির্বাহী পরিচালক হিসাবে রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে হেপাটাইটিস সি স্টাডি অফ স্টাডি সেন্টারে কর্মরত রয়েছেন।

চার্লস এম. রাইস
Invest in Social

Qazi Akash

শিক্ষার্থী: গণিত বিভাগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *