শ্রীনিবাস রামানুজনঃ উপমহাদেশের গণিতবিদ্যার রয়্যাল কিং

গণিত আর সংখ্যাতত্ব ভালোবাসেন কিন্তু রামানুজনকে চেনেন না এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া হয়তো যাবে না। শ্রীনিবাস রামানুজনকে বলা যায় এই উপমহাদেশের গণিতবিদ্যার রয়্যাল কিং।

তিনি ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার মাদ্রাজ প্রদেশের তাঞ্জোরের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ছোট অফিস সহকারি এবং মা ছিলেন গৃহিনী।

খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। রামানুজনের মুখস্থশক্তির ক্ষমতা দেখে পাড়ার লোকেরা পর্যন্ত অবাক হতে শুরু করে।

পাই (pi) বা ২-এর বর্গমূলের মান দশমিকের পর অনেক দূর পর্যন্ত বলে যেতে পারতেন তিনি। অসাধারণ প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তার স্কুল থেকে তিনি বৃত্তিও পান।

রামানুজনের গাণিতিক প্রভিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে মূলত G.S.Carr এর “Synopsis of Elementary result in Pure and Applied Mathematics” বইটি পড়ার পর থেকে। এ বইটি তার এক বন্ধু তাকে পড়তে দিয়েছিলেন।

১৯০৩ সালে অত্যন্ত ভালো রেজাল্ট করে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি, কিন্তু গণিতে শাস্ত্রে অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে কলেজে এসে ইংরেজি ফেল করে বসেন রামানুজন।

এরপর গণিত নিয়ে বিশদ গবেষণার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান রামানুজন। তাঁর মা ছেলেকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে কান্নাকাটি করে শেষমেষ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেন। এরপর অবশ্য তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়।

ছোটবেলা থেকেই মৌলিক সংখ্যা নিয়ে রামানুজনের ছিলো প্রচন্ড আগ্রহ। কোনো একটা সংখ্যা মৌলিক কি না, এটা জানতে হলে দেখতে হয় সেই সংখ্যাটিকে অন্য কোনো সংখ্যা দিয়ে নিঃশেষে ভাগ করা যায় কি না।

গণিতবিদদের ভাষায় একে বলা হয় সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করা। রামানুজন কাজটা করে ফেলতে পারতেন আশ্চর্য দ্রুততায় ও নির্ভুলভাবে।

সে সময়েই রামানুজন অয়লারের ধ্রুবক আর বার্নোলির সংখ্যা নিয়েও কাজ করতে শুরু করেন। তিনি ম্যাজিক স্কয়ার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। বৃত্তের বর্গসম্পর্কিত তাঁর গবেষণাকর্ম পৃথিবীর বিষুবরৈখিক পরিধির দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে ভূমিকা রাখে৷

রামানুজনের কিন্তু কোন স্থায়ী চাকরি ছিলো না। বিয়ের পর তিনি নিজের স্বভাবের বিপরীতে চাকরির খোঁজে বের হন।

তার ঘনিষ্ঠ একজন একটি রেফারেন্স লেটার তার হাতে ধরিয়ে চাকুরির সুপারিশ করে তাকে মাদ্রাজ থেকে আশি কিলোমিটার দূরের নিলোর শহরের কালেক্টর দেওয়ান বাহাদুর রামচন্দ্র রাও-এর কাছে পাঠান।

রামচন্দ্র রাও কিছুদিনের জন্য রামানুজনের সকল ব্যয়ভার বহন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু তার জন্য কোন বৃত্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় এবং রামানুজন দীর্ঘকাল অপরের গলগ্রহ হয়ে থাকতে রাজি না হওয়ায় তিনি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের অধীনে একটি সামান্য পদের চাকুরিতে যোগদান করেন।

কিন্তু তার গবেষণা কর্ম এসবের জন্য কখনো ব্যহত হয়নি। পোর্ট ট্রাস্টে কাজ করার সময় কিছু লোকের সাথে তার পরিচয় হয় যারা তার নোটবুক নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেন।

এর সূত্র ধরে গণিত বিষয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের সাথে তার যোগাযোগ হয়।

১৯১১ সালে তার প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ Journal of the Mathematical Society পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সংখ্যাতত্ত্বের উপর তার গবেষণালব্ধ Some Properties of Bernoulli’s Numbers নামে তার প্রথম দীর্ঘ প্রবন্ধ একই বছর প্রকাশিত হয়।

১৯১২ সালে একই পত্রিকায় তার আরো দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং সমাধানের জন্য কিছু প্রশ্নও প্রকাশিত হয়।

নিবন্ধ প্রকাশের পর অনেকেই চেষ্টা করেছিলেন রামানুজনের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ভারতবর্ষে তিনি তার প্রতিভার দাম পেলেন না।

শেষমেশ রামানুজন নিজেই ব্রিটিশ গণিতবিদদের কাছে চিঠি লিখতে শুরু করেন। এভাবেই ১৯১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার – ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম যুগান্তকারী চিঠিটি লেখেন তিনি (দ্বিতীয়টি ঢাকা থেকে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে লিখেছিলেন সত্যেন বসু)।

প্রায় ১৫ দিন পর ৩১ জানুয়ারি ওই চিঠি কেমব্রিজের গণিতবিদ জি, এইচ, হার্ডির হাতে পৌঁছায়। প্যাকেট খুলে হার্ডি পেলেন এগারো পাতার সংযোজনীসহ একটি পত্র।

রামানুজন নিজেকে “মাদ্রাজ বন্দরে” বছরে ২০ পাউন্ড বেতনের একজন “কেরানি” হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁর গাণিতিক বিষয়গুলো দেখার জন্য হার্ডিকে অনুরোধ করেছেন।

আসলে রামানুজনের বেশির ভাগ কাজই একেবারে নতুন, মাদ্রাজের কেউ বিষয়গুলো ধরতে পারতেন না। কিন্তু অভিজ্ঞ গণিতবিদ হার্ডি একনজর দেখেই তাঁর অনেকগুলোই চিনতে পারলেন।

এগারো পাতায় প্রায় ১২০ টি গাণিতিক হিসাব ও ফলাফল দিয়েছেন রামানুজন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিদঘুটে ব্যাপারটি ছিলো পৃথিবীর সব ধনাত্মক সংখ্যার যোগফল হলো ঋণাত্মক এক-দ্বাদশাংশ। এটি মূলত অয়লারের জেটা (zetta function) ফাংশন থিওরি, যেটি রামানুজন নিজে নিজেই আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন।

হার্ডি এবং লিটলউড – দুজনে মিলে বোঝার চেষ্টা করলেন রামানুজন উদ্ধৃত সূত্র বা উপপাদ্যগুলো। শেষমেশ দুজনে মিলে এ সিদ্ধান্তে এলেন যে এগুলো অবশ্যই সত্য, নইলে এগুলো উদ্ভাবনের কথা কারও কল্পনাতেও আসতো না।

বাট্রান্ড রাসেল সে সময় কেমব্রিজে। তাঁর ভাষায়, “হার্ডি আর লিটলউডের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁরা দ্বিতীয় নিউটনকে খুঁজে পেয়েছে।”

হার্ডি রামানুজনকে চিঠি লিখে জানান, চিঠি ও উপপাদ্যগুলোর ব্যাপারে তিনি আরো জানতে চান, রামানুজন যেন কয়েকটা উপপাদ্যের প্রমাণ লিখে পাঠান। এরপর হার্ডি রামানুজনকে ইংল্যান্ডে আনার ব্যবস্থা করেন।

১৯১৪ সালে তাঁর প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি পাই-সংক্রান্ত একটা হিসাব করেন কোনো গণনাযন্ত্র ছাড়াই যেটি খুবই অদ্ভুত ভাবে এখনকার হিসাবের অনেক কাছাকাছি।

তিনি পাইয়ের সারি সারি ধারা বের করেন, এ থেকেই সবশেষে তিনি বের করলেন নতুন এক ফাংশন, এখন যার নাম “উপবৃত্তাকার ফাংশন”।

১৯১৫ সালে রামানুজন গাণিতিক ফাংশনের সর্বোচ্চ মান এবং উৎপাদকের সংখ্যা নিয়ে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেন। এর পরপর কয়েক বছর ধরে রামানুজন আরও নিবন্ধ লিখলেন।

এর একটি হার্ডির সঙ্গে যৌথভাবে, “পার্টিশন ফাংশন” নিয়ে। রামানুজনের অনুমিতি (Ramanujan conjecture) ছিলো টাউ ফাংশনের (tau function) আকার নিয়ে একটা পূর্বানুমান।

১৯১৮ সালে ৩১ বছর বয়সে দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে রামানুজন ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হন। এর আগে ৩১ বছর বয়সী কেউ এই সমিতির ফেলো হতে পারেননি।

একই বছরের ৩১ অক্টোবর রামানুজন ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হলে তাঁর আর্থিক কষ্টের অবসান ঘটে।

১৯১৭ সালে হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকদের ধারণা ছোটবেলার কোনো জন্ডিসের জীবাণু তিনি লন্ডনে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। লন্ডনের শীতে তিনি কাবু হয়ে পড়েন। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৩ মার্চ তিনি ভাঙা শরীর নিয়ে মাদ্রাজে ফিরে আসেন।

এ শরীর নিয়েও তাঁর গণিতযুদ্ধ চলতেই থাকে। প্রথম থেকেই রামানুজন তাঁর সব গবেষণালব্ধ ফল নোটখাতায় টুকে রাখতেন। এ রকম চারটি নোটবইয়ের বিভিন্ন ফলাফল থেকে গণিতবিদেরা এখনো অনুপ্রেরণা খুঁজে নেন।

অসুস্থ রামানুজনকে একবার দেখতে গিয়েছিলেন তার বহু দিনের সাথী হার্ডি। হার্ডির ট্যাক্সির নম্বর ছিলো ১৭২৯। হার্ডির কাছে এই সংখ্যাটির মোটেই কোনো আকর্ষণ ছিল না।

অসুস্থ রামানুজন বললেন ব্যাপারটা একেবারেই ঠিক না। এটি হলো সবচেয়ে ছোট সংখ্যা, যাকে দুটি ধ্বনাত্মক সংখ্যার ঘনকের যোগফল হিসেবে দুভাবে প্রকাশ করা যায়।

১^৩ + ১২^৩
অথবা
৯^৩ + ১০^৩

১৯২০ সালের ২৬ এপ্রিল মাত্র ৩২ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন রামানুজন
১৯২০ সালের ২৬ এপ্রিল মাত্র ৩২ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন এই মহান মানুষটি।

হার্ডি প্রশ্ন করলেন, এর পরের সংখ্যাটি কত? রামানুজন উত্তর দিলেন, এ মুহূর্তে বলতে পারছি না, কিন্তু সে সংখ্যাটি অনেক বড় হবে।

পরবর্তীতে কিছুকাল যক্ষ্মা রোগে ভোগার পর ১৯২০ সালের ২৬ এপ্রিল মাত্র ৩২ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন এই মহান মানুষটি।

অবিশ্বাস্য রকমের প্রতিভা নিয়ে জন্মানো এমন গণিতবিদ এ পৃথিবীতে সত্যিই বিরল। তিনি রেখে গেছেন এমন এক যুগান্তকারী অবদান যা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে গণিতের পৃথিবীতে।

আজ ২২শে ডিসেম্বর, মহান এই গাণিতবিদের ১৩৩ তম জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন শ্রীনিবাস রামানুজন!!!

সূত্রঃ উইকিপেডিয়া, রোর বাংলা

লেখাঃ  সাব্বির আহমেদ ইমন

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *