জেনেটিক ক্লোনিংঃ লুকিয়ে থাকা আর্শিবাদ নাকি ভীতি?

“জেনেটিক ক্লোনিং বা জীন ক্লোনিং” বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে একটি।এটি নিতান্তই বিজ্ঞানের নতুন একটি শাখা।তবে ভবিষ্যতে এর ব্যাপ্তি পৃথিবী ব্যাপি ছড়িয়ে পড়ার একটি বড় আশঙ্কা বিজ্ঞানীরা করছেন।

জিন ক্লোনিং ব্যাপারটি হলো মূলত কোন জীবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিনকে হুবুহু কপি করা।

ব্যাপারটিকে যদি আরও সহজ ভাবে ব্যাখ্যা করি তবে এমন দাড়ায়,
একটি জবার ডাল ভেঙে অন্য কোন স্থানে রোপন করলে হুবুহু মাতৃ বৈশিষ্ট্যের একটি উদ্ভিদ তৈরি হবে।এভাবে উৎপন্ন উদ্ভিদকে বলা হয় ক্লোনাল উদ্ভিদ।বর্তমানে আমাদের চা বাগান গুলোতে ক্লোনাল পদ্ধতিতে বংশবিস্তারের মাধ্যমে বাগান বিস্তার করা হচ্ছে।

জিন ক্লোনিং এর মাধ্যমে বর্তমানে সহজেই কোন প্রানীর কৃত্তিম ভাবে বংশবিস্তার করা সম্ভব হচ্ছে।এমনকি এই পদ্ধতির মাধ্যমে সেই প্রানীটির মতো দেখতে হুবুহু আরেকটি ক্লোন তৈরি করা সম্ভব।

জিন ক্লোনিং মূলত তিন ধরনেরঃ
১)ডিএনএ ক্লোনিং
২)রিপ্রোডাকটিভ ক্লোনিং
৩)থেরাপিউটিক ক্লোনিং

জিন ক্লোনিং এর ইতিহাস খুব একটা বিস্তৃত নয়।১৮৮৫ সালে সর্বপ্রথম  জার্মান বিজ্ঞানি হ্যান্স  এডলফ এডওয়ার্ড স্যালাম্যান্ডারের ক্লোনিং নিয়ে গবেষনা করেন।

১৯০২ সালে উনি একটি স্যালাম্যান্ডারের একটি ভ্রুনথেকে দুটি একই রকম স্যালাম্যান্ডার তৈরি করতে পারেন।১৯৭০সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন গারডন একটি ব্যাঙের স্কিন সেল থেকে দুটি ক্লোন উৎপন্ন করেন।১৯৮১ সালে বিজ্ঞানী কার্ল এবং পিটার হোপ সর্বপ্রপথম ইদুরকে ক্লোন করার চেষ্টা করেন।

১৯৯৬ সালে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম  ডলি নামক একটি ভেড়াকে ক্লোন করা সম্ভব হয়।যা ছিলো পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ক্লোন করা কোন স্তন্যপায়ী,আর এ সাফল্যের নেপথ্য কারিগর ছিলো ইয়ান উইলমুট আর কেইথ ক্যাম্পবেল।

১৯৯৮ সালে সর্বপ্রথম একটি ইদুরকে ক্লোন করা হয়।২০০০সালে বিজ্ঞানীরা একটি রেসাস বানর এবং একটি শূয়রকে ক্লোন করেন।২০০১ সালটি ছিলো ক্লোনিং এর ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ  অধ্যায়। এ বছর বিজ্ঞানীরা একটি করে  গরু,মহিষ এবং বিড়ালকে ক্লোন করেন।এতে করে আমাদের প্রিয় পোষ্য গুলোকে পুনরায় ফিরে পাবার একটি সুযোগ তৈরি হয়।

২০০৩সালে হরিন এবং একই একটি ঘোড়ার ক্লোনিংও সম্পন্ন করেন বিজ্ঞানীরা।২০০৯সালে সর্বপ্রথম  বিজ্ঞানীরা কোন বিপন্নপ্রায় প্রানীকে ক্লোন করতে সম্পন্ন হন,প্রানীটির নাম “Pyrenean ibex” যদিও এর স্থায়ীত্বকাল ছিলো মাত্র সাত মিনিট তাও এটি ছিলো তৎকালীন  বিজ্ঞানী মহলের জন্য সত্যিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ  ছিলো।

জিন ক্লোনিং নিয়ে বর্তমান পৃথিবীতে ভালই দোদুল্যতা চলছে।পৃথিবীর প্রায় ৪৬টি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জিন ক্লোনিং এর ওপর নিয়ন্ত্রনারোপ করে এদের মধ্যে সুইডেন,কানাডা,ফ্রান্স,ইউএসএ এর মতো উন্নত দেশগুলোও সামিল।অপরদিকে জাপান,চায়নার মতো দেশগুলোতে জিন ক্লোনিং নিয়ে পুরোদমে গবেষণা  চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

জিন ক্লোনিং নিয়ে আলোচনা হওয়ার সবচেয়ে বড় কারনটি হলো নৈতিকতার প্রশ্ন।তাছাড়া আরও কিছু বড়বড় কারন রয়েছে যা দেখিয়ে ক্লোনিং বিরোধীরা ক্লোনিং এর বিরোধীতা করছেন।

রিপ্রোডাকটিভ ক্লোনিং এর মাধ্যমে থিওরেটিকালি প্রায় প্রতিটা প্রানীর দেহের একটি সেল থেকে ডিএনএ  সংগ্রহ করে সেই ডিএনএ কে যথাপোযুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি ক্লোন বানানো সম্ভব।সে হিসেবে মানুষদের ক্ষেত্রেও তা কার্যকরি।অর্থাৎ থিওরেটিকালি মানুষের ক্লোন করা সম্ভব যা বর্তমানে এই টপিকটিকে  আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে।

ন্যাশানাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন(NCBI) এর হিসেব অনুযায়ী পৃথিবীতে বন্ধ্যা দম্পতির সংখ্যা প্রায় ৪৮মিলিয়নের বেশি।যা পৃথিবীর সর্বমোট জুগলজোড়ের প্রায় পনেরো পার্সেন্ট।যদি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে যাই তবে ওমেনহেলথ ডট কম এর তথ্য মতে ইউএসএ এর প্রায় ১৩%দম্পতি অনুর্বর যা সংখ্যায় প্রায় ছয় মিলিয়নের থেকে কিছুটা বেশি।

এক্ষেত্রে হিউম্যান ক্লোনিং এই বিশাল সংখ্যক দম্পতিদের কাছে একটি আশির্বাদের মতোই আপাত পক্ষে মনে হচ্ছে।কিন্ত এর বিপরীতে কতগুলো চমকে দেয়া ফ্যাক্টও রয়েছে।

প্রথমেই হিউম্যান ক্লোনিয়ের  সংক্ষিপ্ত ইতিহাস যেনে আসা যাক,

জেবিএস হালদেনই,একজন ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট ১৯৬৯ সালে যিনি কিনা সর্বপ্রথম হিউম্যান ক্লোনিং এর ধারনাটি প্রবর্তন করেন।নোবেল প্রাইজ প্রাপ্ত জেনেটিসিস্ট জসুয়া লিডারবার্গ সমকালীন সময়ে হিউম্যান ক্লোনিং কে সাপোর্ট করেন।তিনি বায়োএথিসিস্ট লিওন কাস এর সাথেও তর্কে জড়ান,যিনি কিনা হিউম্যান ক্লোনিং  নিয়ে একটি স্টেটমেণ্ট দেন,

“The programmed reproduction of man will, in fact, dehumanize him.”

অর্থাৎ,নৈতিকতার প্রশ্নে,হিউম্যান ক্লোনিং কোন ভাবেই উনার কাছে গ্রহনযোগ্য ছিলো না।

ডলি ভেড়ার জন্মএর পর পুনরায় হিউম্যান ক্লোনিং নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নৈতিকতার প্রশ্নে তখন এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করে।যদিও কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীরা হিউম্যান ক্লোন করার জন্য তখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো।

তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮সালে সর্বপ্রথম মানুষের হাইব্রিড ক্লোন তৈরি করতে পারেন বিজ্ঞানীরা।মানুষের পায়ের একটি কোষ সংগ্রহ করে তার নিউক্লিয় বস্তু গুলোকে গরুর এগ এর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়।তৈরি হয় বিশ্বে প্রথম হাইব্রিড মানব ভ্রুন, যদিও ভ্রুনটি বারোদিন পর ধংস হয়ে যায়।

২০০২ সালে ২৬ ডিসেম্বর বাহামার একটি ক্লোনিং কোম্পানি ‘ক্লোনয়েড” প্রথম ক্লোন  মানব সন্তান জন্মদেয়ার দাবি করে।যদিও যথেষ্ট প্রমানের অভাবে সে দাবিটি বাতিল হয়ে যায়।২০০৩সালে ফরাসি  এক বিজ্ঞানী যিনি কিনা Raelian sect Brigitte Boisselier  এর সদস্যও বটে সংবাদ সংস্থা এএফপি এর বরাত দিয়ে ক্লোন বেবির সফল জন্মদানের কথা ঘোষনা করেন।

২০০৪সালে বাহামা ভিত্তিক ক্লোন কোম্পানি ক্লোনয়েড পুনরায় হিউম্যান ক্লোনিং এর দাবি জানায়।তাছাড়া আরও অনেকেই হিউম্যান ক্লোনিং এর দাবি জানায়,তবে কেউই  এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমান দিতে পারে নি।

ভবিষ্যতে যদিও বা কখনো হিউম্যান ক্লোনিং সহজলভ্য হয় তবে এতে প্রকৃত পক্ষে এতে মানুষ প্রাকৃতিক ভাবে প্রজননের প্রতি ধীরে অনাকৃষ্ট হবে।কারন স্বাভাবিক প্রজননের জন্য মানবদেহে যে রকমের ফিজিওলজিকাল পরিবর্তন হয়,জিন ক্লোনিং এর মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ওইরকম ফিজিওলজিকাল পরিবর্তনের কোন প্রয়োজনই পড়ে না।ফলে মানুষ তার স্বাভাবিক ইন্সটিক্ট অনুযায়ী তুলনামূলক সহজ অপশন টাকেই বেছে নেবে।

আর সে সহজ অপশনটা যদি হয় হিউম্যান ক্লোনিং তবে এর সূদুরপ্রসারী ফল ভোগ করতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কে।কেননা একটি সুস্থ সুশীল প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ মাতৃত্বের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।আর এই মাতৃত্বের অধিকাংশটাই তৈরি হয় মা যখন গর্ভধারন করে শিশুকে আগলে রাখেন ঠিক তখন।যদি মা তার৷ শিশুকে আগলে রাখার সুযোগই না পায় তবে সুস্থ মাতৃত্ব তথা প্রজন্মের আশা করা সত্যিই অর্থহীন।

আর তাছাড়া আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্যনীয়,তা হলো,ক্লোনিং এর ক্ষেত্রে সফল ক্লোনিং এর সাকসেস রেট মাত্র ১%।অর্থাৎ, ১০০টি ভ্রুনের মধ্যে মাত্র একটি ভ্রুনকেই পূর্নাঙ্গ প্রানী রূপে জন্মদান সম্ভব।যেমন,ডলি নামক ভেড়াকে ক্লোন করার সময় প্রায় ৫০০বারেরো বেশি চেষ্টা করা হয়।ভেড়ার জায়গায় যদি মানুষের ৫০০টি ভ্রুন নষ্ট করে একটি ক্লোন তৈরি করা হয় তবে তা কতটুকু নৈতিক হবে?

এছাড়া বর্তামানে,জিন ক্লোনিং এর মাধ্যমে প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রানীদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

জাপানের আর রাশিয়ার একদল বিজ্ঞানী  একত্র হয়ে,প্রাগৈতিহাসিক প্রানী ম্যামথ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন।ম্যামথ ক্লোনিং এর জন্য ইতিমধ্যেই সাইবেরিয়া থেকে প্রায় ২৮০০০বছরের পুরোনো ফ্রোজেন ম্যামথ মমি থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করেন।এতে করে প্রাগৈতিহাসিক প্রানীদের ফিরিয়ে এনে তারা বেচে থাকা কালীন সময়ে পৃথিবীর আবাহাওয়া,জলবায়ু,বাস্ততন্ত্র সহ নানা বিষয়ে বিস্তর ধারনা পাওয়া যাবে।

তবে,এতে করে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়?

প্রকৃতির কিছু নিয়ম রয়েছে।প্রকৃতি সবসময়ই দুর্বলদের অস্তিত্ব মুছে দেয়।ব্যাপারটাকেই ডারউইন বলেছেন,”সারভাইভাল টু দ্যা ফিটেস্ট।”তাই এইসব প্রানীকে পুনরায় ফিরিয়ে আনলে তাকে কোন ভাবেই প্রাকৃতিক নিয়মের বাত্যয় হয় নি বলার সুযোগ নেই।

যে প্রানীগুলো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে,তারা চলে যাবার পরে পৃথিবীতে আবাহাওয়া এবং জলবায়ুগত কি ধরনের পরিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে বিস্তর গবেষনা না করে যদি প্রাগৈতিহাসিক পানীগুলোকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা সফল হয়েও থাকে,তবে তাদের জীবনকালের স্থায়িত্ব  নিয়ে থাকবে ব্যাপক প্রশ্ন।

বর্তমানে থেরাপিউটিক জিন ক্লোনিং নিয়েও গবেষনা ধীরে ধীরে বাড়ছে।থেরাপিউটিক ক্লোনিং এর মাধ্যমে মূলত আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ  অঙ্গসৃষ্টি কারি স্টেমসেলগুলোকে ক্লোন করা হয়।এতে করে ভবিষ্যতে  আমরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল হলে সহজেই আর্টিফিশিয়ালি তৈরি অরগানগুলো প্রতিস্থাপন করার সুযোগ পাবো।

ইউএসএতে বর্তমানে প্রায় ১১৪০০০হাজার মানুষ অরগান ট্রান্সপ্লান্ট এর ওয়েটিং লিস্টে রয়েছেন।প্রতি দিন প্রায় গড়ে ২০জন লোক মারা যাচ্ছে শুধু অরগান ট্রান্সপ্লান্ট এর অভাবে।

ইউএসএ তে প্রতি ১০মিনিটে একজন ব্যাক্তি অরগান ট্রান্সপ্লান্ট প্রত্যাশিদের লিস্টে নিজেকে যুক্ত করছে।ইউএসএ তে প্রতি বছর প্রায় ১২০০০০ হাজার মানুষ কিডনি আর লিভার ঘটিত রোগে মারা যাচ্ছেন।এতো খালি ইউএসএ এর পরিস্থিতি।সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থা অবস্থা আরও খারাপ।

তাই একটি বিশাল সংখ্যক মানুষের সংকটাপন্ন জীবন রক্ষার্থে থেরাপিউটিক ক্লোনিং এর ভূমিকা ভবিষ্যতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে কিছু জিনিস একটু জেনে নিলে ভালো হয়।অরগান ক্লোন করার জন্য যে ধরনের স্টেম সেল প্রয়োজন তা খুবই স্পেসিফিক আর মানব দেহে সংখ্যায় খুব নির্দিষ্ট।এছাড়াও থেরাপিউটিক ক্লোনিং এর জন্য প্রয়োজনীয় ফিমেল এগসেলের অপ্রতুলতাও বিদ্যমান।তাছাড়া,এগ সেল নিষ্কাশন নারীদেহের জন্য যথেষ্ট যন্ত্রনা দায়কও বটে।সর্বোপরি,থেরাপিউটিক ক্লোনিং খুবই খরুচে বলা যায়।

এত খরচ করার পরেও যদি আপনার ট্রান্সপ্লান্ট করা অরগানের সেলগুলো যদি মিঊটেশন করে টিউমার তৈরি করে নিশ্চই আপনার ভালো লাগবে না?এক্ষেত্রে জীবন নাশের একটি ব্যাপক সম্ভাবনা থেকে যায়।

তাছাড়া,বিপদসঙ্কুল তথা বিলুপ্তপ্রায় প্রানীদের প্রাচুর্যতা  ফিরিয়ে আনার একটা ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

ধারনা করা হচ্ছে,আমাদের বাংলাদেশের অহংকার রয়েল  বেঙ্গল টাইগার সহ বিগ ক্যাটদের সবাইই এশতকের শেষ নাগাত বিলুপ্ত হতে পারে।আইইউসিএন এর তথ্যানুযায়ী প্রায় ত্রিশ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রানী বিলুপ্তির পথে।এদের বিলুপ্তি হলে ধরে নিতে হবে আমাদের বিলুপ্তিও প্রায় সুনিশ্চিত।তাছাড়াও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ব্যাপারটাও পুরো নষ্ট হয়ে যাবে।

প্রানী বিলুপ্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাড়াতে পারে জিন ক্লোনিং। এর মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় প্রানীদের পুনরায় ফিরিয়ে এনে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯সালে সর্বপ্রথম  বিজ্ঞানীরা কোন বিপন্নপ্রায় প্রানীকে ক্লোন করতে সম্পন্ন হন,প্রানীটির নাম “Pyrenean ibex” যদিও এর স্থায়ীত্বকাল ছিলো মাত্র সাত মিনিট তাও এটি ছিলো তৎকালীন  বিজ্ঞানী মহলের জন্য সত্যিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ  ছিলো।

২০০২সালের  সায়েন্সম্যাগ ডট ওআরজি এর তথ্য মতে বিভিন্ন প্রানীদের করা ক্লোনদের মধ্যে অনেকগুলোতেই জেনেটিকাল ডিফেক্ট লক্ষ্য করা যায়।এদের মধ্যে অনেকগুলোরই ইম্পোর্টেন্ট অরগান যেমন,হার্ট,লিভারের গঠনগত বৈশিষ্ট্যে ডিফেক্ট বিদ্যমান ছিলো।

তাছাড়া ক্লোনিংয়ের পদ্ধতি অনেক খরুচে হওয়ার কারনে দীর্ঘমেয়াদি গবেষনার জন্য খরচ বহন করা সত্যিই খানিকটা দুঃসাধ্য।তাই  জিন ক্লোনিং  এর থেকে বেশি গুরুত্ব বিপন্ন প্রায় প্রানীদের প্রাকৃতিক প্রজননের ওপর দেয়ার  জোর দিয়েছেন অনেক বিজ্ঞানি।

ক্লোনিং এর ভালো মন্দ দুটো দিকই যদি বিবেচনায় নিই আমরা তবে এর পক্ষে বিপক্ষে দুধরনের মানুষই পাবো।

তবে নৈতিকতার বিচারে কখনই এটি মানুষের  মানদন্ডে উন্নিত হতে পারবে না।

যারা পক্ষে আছেন তাদের দেয়া যুক্তি গুলোর মধ্যে অন্যতম কিছু যুক্তি এবং এর বিপক্ষে থাকা মানুষদের বিপরীত যুক্তি গুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো,

ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে বিপন্ন প্রানীকূল্কে রক্ষার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।কিন্ত উপরের আলোচনা থেকে  বোঝাই যাচ্ছে সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন।তাছাড়া ক্লোন প্রানীগুলোতে প্রোগ্রামড জেনেটিকাল কনটেন্ট থাকার কারনে এসব প্রানীর মধ্যে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা খুবই কম।যার ফলে ক্লোন করে এদের পর্যাপ্ততা  অস্তিত্ব সংকট তখনো বিদ্যমান থাকবে।

বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ক্লোনাল প্রানীগুলোর মাধ্যমে।কিন্ত ক্লোনিংয়ে এ যে পরিমান খরচ হয় তা নিয়ে সংশয় রয়েই যায়।

পোষা প্রানীর মালিকেরা সহজেই তাদের প্রিয় পোষ্যের অবয়ব পোষ্য ফিরে পেতে পারবে।যদিও সবার পক্ষে এই ব্যায় বহন করা সম্ভবপর নাও হতে পারে।সাধারন একটি বিড়াল ক্লোন করতেই প্রায় ২৫০০০ইউএস ডলার খরচ হয় আর একটি কুত্তা সরি কুকুর ক্লোন করতে প্রায় ১লাখ ইউএস ডলার খরচ হয়।একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে,আমেরিকার প্রায় পনেরোটি অঙ্গরাজ্য  ক্লোনিং নিষিদ্ধ করে শুধু মাত্র ক্লোনিং বিষিয়ক গবেষনার খরচ হওয়া অর্থ গুলো যেন জনগনের উপকারে লাগানো যায়।

জিন ক্লোনিং এর মাধ্যমে দেহকে জেনেটিকালি ডিজাইনিং এর মাধ্যমে প্রানী দেহ করে ভাইরাস সংক্রমন মুক্ত করা সম্ভব।ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে একটি নির্দিষ্ট ভাইরাস প্রতিরোধি আন্টিবডি উৎপন্ন কারি ডিএনএকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রানীকোষে যুক্ত করে সে কোষ হতে ক্লোনাল প্রানীটি নির্দিষ্ট ভাইরাস প্রতিরোধি হবে থিওরেটিকালি।

তবে এত ব্যায়বহুল প্রক্রিয়ার উৎপন্ন কোন প্রানীর বংশবৃদ্ধি যদি ঠিক মতো না হয় তবে তা সত্যিই হতাশার।গবেষনার দেখা গিয়েছে যে ক্লোনাল প্রানীগুলোতে  গর্ভাধারনের সময় অনেক জটিলতা দেখা যায়,বিশেষ করে থার্ড ট্রাইমেস্টারের সময় বেশি জটিলতা দেখা যায়।

অরগান ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে জীবন রক্ষা।যেটি নিয়ে উপরে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে।

যে যুক্তি গুলো দিয়ে মানুষ ক্লোনিং এর পক্ষে৷ অবস্থান নিয়েছেন প্রায় প্রতিটি যুক্তির বিপরীত যুক্তি বিদ্যমান আছে।

পরিশেষে এটিই বলতে চাই।ক্লোনিং কি আমাদের জন্য আশির্বাদ নাকি হুমকি তা নিয়ে এখনই পরিসমাপ্তি টানার সময় আসে নি।তবে বিজ্ঞান সবসময় ভালো আর  মন্দ দুটোকেই সাথে নিয়ে চলেছে।তবে সবসময়ই যে ভালোর পাল্লা ভারী ছিলো তা কিন্ত নয়।বর্তমানে পৃথিবীতে চলমান হানাহানিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মূল রসদ কি বিজ্ঞান জোগায় নি?

একজন আগন্তক,তার একহাতে কয়েকটি বেলি আর হাসনাহেনার কলি,অপর হাতে একটি অত্যাধুনিক GLOCK17 পিস্তল।

যদি সে আপনার দিকে এগিয়ে আসে তবে তারপ্রতি আপনার অনুভূতি কি হবে?
আপনি কি তার হাতে ফুল দেখে আপ্লুত হবেন নাকি প্রান সংশয়ে খানিকটা দূরে সরে যাবেন।

আজকের লিখাটির মূল বার্তাটি কি তা আপনাদের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিলাম।

লিখাঃপ্রীতম মজুমদার

তথ্যসূত্রঃ

উইকিপিডিয়া 

Kopernik.org

American Transplant Foundation

Invest in Social
Pritom Majumder

Pritom Majumder

A lil creation of the UNIVERSE

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *