প্রানালাপে প্রানের বিজ্ঞান-শেষ পর্ব

আমরা তৈরি করে ফেলেছি প্রাণের ত্রিত্ত্ববাদ, নিউক্লিক এসিড, এমিনো এসিড আর ফসফোলিপিড বায়লেয়ার। আরএনএ থেকে ডিএনএ কীভাবে আসলো, সেইটাও বের করে ফেললাম।নিউক্লিক এসিড আদেশ দেবে, এমিনো এসিড সেভাবে কাজ করবে আর ফসফোলিপিড বায় লেয়ার তাদেরকে ঘিরে একটা প্রতিরক্ষার আবরণ তৈরি করবে। এভাবে আমরা পেয়ে যাবো প্রথম প্রায়-কোষ।

 

কিন্তু,সমস্যা হলো, এরা এক জায়গায়, একই সাথে তৈরি না হলেতো কোষ গঠন হওয়া সম্ভব না।এর নিশ্চয়তা কতটুকু যে এই তিনটা উপাদানই এক জায়গায় তৈরি হয়েছে!তাছাড়া কোষটা পরিচালনার জন্যতো শক্তি দরকার, শক্তিই বা পেলো কোথা থেকে? এই পর্বে এগুলো নিয়েই সামান্য আলোচনা থাকবে।

 

প্রথম সমস্যা; ৩ টা জটিল জিনিস, একই স্থানে,একই সময়ে আসলো কীভাবে?

আসলে প্রশ্নটাই ভুল! কারণ, যদি এরা একত্রে একই সময়ে না এসে থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে “প্রাণ” বলে কিছু থাকতো না। এমন ঘটনাটা হয়েছিলো বলেই আজকে আমাদের অস্তিত্ব আছে!মানে, আমাদের বর্তমান থাকাই এটার প্রমাণ যে ওই তিনটা উপাদান একত্রে এসেছিলো।

 

তাছাড়া, সেই সময়ে পৃথিবী ছিলো শক্তি আর পরমাণুতে পূর্ণ। জায়গায় জায়গায় আগ্নেয়গিরি, উল্কা, হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট, ইউভি লাইট, বজ্রপাত, শক্তির উৎসের অভাব আছে নাকি? না অভাব আছে জৈব যৌগের, এমন হতেই পারে যে এসব জৈবযৌগ গুলো বিক্রিয়া করে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গানু তৈরি করেছিলো,কিন্তু যুক্ত হতে পারেনি।

 

অন্যদিকে,এক্কেবারে র‍্যান্ডমলি, সঠিক সময়ে আর সঠিক জায়গায় তৈরি হয়ে যায় এই তিনটা, এমন হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু শূণ্য না। ফলে, তৈরি হয়ে যায় প্রথম কোষ।আর, প্রায় ৪ বিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফলাফল এই আমি, আপনি, সবাই!

 

আচ্ছা, তাহলে কোষ চালনার জন্য শক্তিটা আসলো কোথা থেকে? শক্তি কোথা থেকে পেল, তা নিয়ে প্রথমদিকের কয়েকটা পর্বে লিখেছিলাম।তাও, আবার একটু মনে করিয়ে দেই।

 

ভেন্টের এলক্যালি তরল আর সমুদ্রের এসিডিক পানির যে ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্ট, সেটা এসিটাইল ফসফেট আর পাইরোফসফেট উৎপাদন করে।এরা অনেকটা এটিপির মতো কাজ করে বলে প্রথম কোষ এদের থেকে শক্তি গ্রহণ করেছিলো।

 

এভাবে কোষ শক্তি গ্রহণ করে, ভেতরে নিউক্লিক এসিড আর এমিনো এসিড রেপ্লিকেশন চলতে থাকে।ধীরে ধীরে বিবর্তন হতে থাকলো, ভেতরের ক্রিয়া-বিক্রিয়াগুলো জটিলতর হতে থাকলো। একসময় বিবর্তিত হলো পাইরোফসফেটেজ নামক এনজাইম।

 

এই এনজাইম পাইরোফসফেটের উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। ফলে, কোষটা সেই ইলেক্ট্রোকেমিকাল গ্রাডিয়েন্ট থেকে আরো বেশি শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হলো। অনেক প্রাচীন ব্যাকটেরিয়া আর আর্কিয়াতে এখনো পাইরোফসফেটেজ পাওয়া যায়।উল্লেখ্য যে, প্রাণের বিবর্তনের বৃক্ষে ব্যাকটেরিয়া আর আর্কিয়াই প্রথম দুইটা শাখা।

 

সময় এগোতে থাকলো, কোষটা নিজের কপি তৈরি করতে সক্ষম হলো। একসময় কিছু প্রোটোসেল এসিটাইল ফসফেট আর পাইরোফসফেটের পাশাপাশি এটিপি ব্যাবহার করা শিখে গেল।মানে আরো বেশি শক্তি, আরো জটিল কোষ।

 

হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থেকে একটু দূরে ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্ট দুর্বল। সেখানে কোষগুলো নিজের গ্রাডিয়েন্ট নিজে উৎপাদন করা শিখে গেল। কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে হাইড্রোজেনের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তি ব্যাবহার করে এরা নিজের মেমব্রেনের চারপাশ ঘুরিয়ে প্রোটন পাম্প করা শুরু করলো।কিন্তু এতে প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ ছিলো খুবই কম, এটিওই উৎপাদনে যথেষ্ট না।

 

কিন্তু, কোষগুলো একই বিক্রিয়া বারবার ঘটিয়ে উৎপন্ন শক্তিকে ইলেক্ট্রোকেমিকাল গ্রাডিয়েন্ট আকারে সংরক্ষণ করতে লাগলো, ফলে একসময় এটিপি উৎপাদনে পর্যাপ্ত শক্তি জমা হয়ে গেল।

 

একবার যখন কোষগুলো নিজেদের শক্তি উৎপাদন করা শিখে গেল, তারা আর হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের ওপর নির্ভরশীল রইলো না। ভেন্টের বাইরেও শক্তি উৎপাদন করে বাঁচতে পারলো।কোষগুলো দুইটা ভিন্ন উপলক্ষে ভেন্ট ত্যাগ করলো। একদল শুরু করলো ব্যাক্টেরিয়ার বিবর্তন, আরেকদল আর্কিয়ার। পৃথিবীতে শুরু হলো প্রাণের দৃশ্যমান স্পন্দন।

 

বোঝা যাচ্ছে যে শক্তি উৎপাদনে ইলেক্ট্রোকেমিকাল গ্রাডিয়েন্ট একটা বড়-সড় ভূমিকা পালন করছে।

 

 

গত উপপর্বে ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্ট নামে একটা শব্দ উল্লেখ করেছিলাম। সেটার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন।
আগে বুঝতে হবে কন্সানট্রেশন গ্রাডিয়েন্ট আর ইলেক্ট্রিকাল গ্রাডিয়েন্ট কি। কোনো স্থানে, দ্রবণের ঘনত্বের পার্থক্যকে বলা হয় কন্সানট্রেশন গ্রাডিয়েন্ট,যা একটা রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বা কেমিক্যাল প্রোপার্টি।

 

মানে, ঘরের এক কোণায় এরোসল স্প্রে করলে সেখানে বায়ুর ঘনত্ব বেড়ে গেল, অন্য স্থানে কম রইলো।আমরা বলবো, এখানে কনসান্ট্রেশন গ্রাডিয়েন্ট আছে। একইভাবে, বৈদ্যুতিক আধানের পার্থক্যকে অথবা বৈদ্যুতিক বিভবকে বলা হয় ইলেকট্রিকাল গ্রাডিয়েন্ট। কিন্তু, জীববিজ্ঞানে এই গ্রাডিয়েন্ট জিনিসটা একটু জটিল।

 

কোষের ভেতরে-বাইরে আয়নের চলাচল হতে থাকে। আবার, কোষে থাকে প্রোটিন, যারা তেমন নড়া-চড়া করেনা, তাদের আধানও আবার অনেকটা ঋণাত্মক। ফলে,কোষের প্লাজমা মেম্ব্রেনে একটা আধানের তারতম্য,ইলেক্ট্রিকাল গ্রাডিয়েন্ট তৈরি হয়। যেই তরলে কোষটা নিমজ্জিত থাকে, তার তুলনায় কোষের ভেতরটা ঋণাত্মক আধান যুক্ত।

একই সাথে, বাইরের তরলের তুলনায়, কোষের ভেতরে পটাশিয়াম আয়নের ঘনত্ব বেশি, সোডিয়াম আয়নের ঘনত্ব কম।

 

ফলে, একটা কনসান্ট্রেশন গ্রাডিয়েন্ট তৈরি হয়।ফলে, সোডিয়াম ক্যাটায়ন কোষের ভেতর ঢুকতে চেষ্টা করে,কারণ ভেতরে সোডিয়ামের ঘনত্ব কম,আবার আধানও বিপরীত!অন্যদিকে, পটাশিয়াম ক্যাটায়ন, ইলেক্ট্রিক গ্রাডিয়েন্টের কারণে কোষের ভেতরে ঢুকতে চাইলেও কোষের ভেতর অলরেডি পটাশিয়াম বেশি, ফলে কন্সানট্রেশন গ্রাডিয়েন্ট তাকে বাধা দেয়। ফলে, এই বেচারা দোটানায় পড়ে যায়। আধান টানে, ঘনত্ব ঠেলে।

 

এই টানা-ঠেলা,ঘোরা-ফেরার নামই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্ট।

 

কোনো আয়নকে, এই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্টের বিরুদ্ধে ঠেলে দিতে কোষকে শক্তি ব্যাবহার করতে হবে। এই শক্তি আসবে এটিপি থেকে। কিছু এক্টিভ ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বা সক্রিয় পরিবহন ব্যাবস্থা, যাকে পাম্প বলা হয়, তারা এইসব আধান আর ঘনত্ব বা গ্র‍্যাডিয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে।প্রাইমারি এক্টিভ ট্রান্সপোর্ট, মেম্ব্রেনের চারপাশে আয়নকে ঘুরিয়ে এনে আধানের পার্থক্য তৈরি করে, আর এই আধানের ফলে তৈরি ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্ট দ্বারা প্রভাবিত বস্তুর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে সেকেন্ডারি এক্টিভ ট্রান্সপোর্ট।

 

আবার, এই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল গ্রাডিয়েন্ট এর ফলে মেম্ব্রেনে তৈরি হওয়া বিভব শক্তি এটিপি উৎপাদনে কাজ করে। ফলে, একটা কোষের জন্য উপযুক্ত শক্তি-চক্র তৈরি হয়ে গেল। আমাদের প্রাচীন পৃথিবীর কোষগুলো এখন নিজেরাই শক্তি উৎপাদনে স্বনির্ভর, যেকোনো জায়গায় ঘুরতে-ফিরতে প্রস্তুত।

 

আমরা পেয়ে গিয়েছি নিজের কপি তৈরিতে সক্ষম কোষ।কিন্তু তারা এখনো সরল, একা, একক,সিঙ্গেল। এইবার আমাদের দিকে তাকান, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষের সমষ্টি,এটা হলো কীভাবে?

 

এই ঘটনাকে বলে মেজর ইভোলুশনারি ট্রানজিশন বা “বৃহৎ বিবর্তনীয় রূপান্তর”। এককোষ থেকে কীভাবে মাল্টি-সেলুলার অর্গানিজম বা বহুকোষী জীব আসলো,প্রোক্যারিওটিক সেল থেকে কীভাবে ইউক্যারিওটিক সেল আসলো,সেই প্রক্রিয়া।

 

পৃথিবীতে সবচেয়ে আদি যেসব ফসিল পাওয়া যায়, তার মধ্যে স্পঞ্জ জাতীয় জীবরা অন্যতম। এরা অত্যন্ত সরল, কতগুলো ইউক্যারওটিক সেলের সমষ্টি মাত্র। কিন্ত, প্রথমেতো ছিলো প্রোক্যারিওটিক, ইউক্যারিওটিক আসলো কীভাবে?

 

১৮৩০ সাল, এনাটমিস্ট থিওডোর শোয়ান ধারণা দেন যে মানব দেহ আসলে একক কোনো জিনিস না, এটা হলো অসংখ্য জীবন্ত কোষের সমষ্টি, যারা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।

 

এখন এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু শুধু এইটুকুই? না, আরো চমক আছে। দিন দিন বিজ্ঞান উন্নত হলো, গবেষণা করে দেখা গেল যে, এই কোষের ভেতর আবার কত যন্ত্র-পাতি আছে। এমন একটা যন্ত্রের নাম মাইটোকন্ড্রিয়া।যা বড় অদ্ভুত জিনিস!

 

এই মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব জিন আছে, এ বংশবৃদ্ধি করে, হোস্ট সেলের ভেতর মারাও যায়।এরা হোস্ট সেলের।উৎপাদিত পুষ্টি ব্যাবহার করে ও কোষকে এটিপি দান করে।মানে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা কাজ করে, কোষ মারা গেলে মাইটোকণ্ড্রিয়াও মারা যাবে, মাইটোকন্ড্রিয়া মারা গেলে কোষও মারা যাবে।আর মাইটোকন্ড্রিয়ার সব বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হয়, এ মনে হয় আগে স্বাধীন কোনো জীব ছিলো! সেই কথা পরে বলছি।

 

মানুষের ভেতর কোষ, কোষের ভেতর মাইটোকন্ড্রিয়া, এতটুকু হলে ঠিক ছিলো। দেখা গেল, এতেই শেষ না।

 

অনেকদিন আগে আলুতে একধরনের অদ্ভুত রোগ দেখা দিলো। গবেষণা করে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেল না। তাহলে এই রোগ ছড়াচ্ছে কে? থিওডোর ডিনার নামে এক বিজ্ঞানী এগিয়ে আসলেন, গবেষণা করে দেখলেন, এই রোগের কারণ হলো জিন। তিনি এর নাম দেন “ভাইরয়েড”। একটা আলু থেকে বাতাসের মাধ্যমে, পোকা-মাকড়ের মাধ্যমে, স্পর্শের মাধ্যমে এই জিন অন্য আলুতে ছড়িয়ে যেতো।তারপর বংশবিস্তার করতো। নিশ্চই মনে আছে যে ডিএনএ রেপ্লিকেট করতে পারে?মানে, জিনও একপ্রকার স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে!

 

তাহলে ঘটনাটা কী দাড়ালো? দেহ গঠিত কোষ দিয়ে, কোষের ভেতর মাইটোকন্ড্রিয়া, মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতর জিন। এটাতো হঠাৎ করে হয়নি, নিশ্চই একটা ব্যাখ্যা আছে, সেটা এবার বলছি।

 

এমন ঘটনা ঘটে কোঅপারেশনের বা পরস্পর সহযোগিতার কারণে।স্বাধীন কতগুলো জীব, কোনোভাবে একত্রে যুক্ত হয়ে যায়, তারপর সময়ের সাথে সাথে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, আর সেভাবেই বিবর্তিত হয়। একসময়, তাদেরকে আর আলাদা করা যায়না, তারা একটা একক জীব হয়ে ওঠে। একেই বলা হচ্ছে মেজর ইভোলুশনারি ট্রানজিশন।আর,এর প্রমাণও আছে। কারণ বর্তমানে আমরা ল্যাবেই এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে পারি।

 

১৯৯৮ সাল, ল্যাবে একটা প্রোটিস্ট কোষকে কতগুলো এলজির মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রোটিস্ট এলজি খাবে আর বংশবৃদ্ধি করবে। এবার, সব এলজি একরম ছিলোনা, না হওয়ার স্বাভাবিক। দেখা গেল, বংশবিস্তারের সময় কিছু এলজি আর আলাদা হতে পারলোনা, মানে দুইটা কোষ একসাথে জোড়া লেগে রইলো। বড় কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে হলে আমরা তাকে বিকলাঙ্গতা বলি।কিন্তু, এলজির জন্য এটা আশীর্বাদ।

 

প্রোটিস্টের মুখের একটা সাইজ আছে, এর চেয়ে বড় কোনোকিছু সে খেতে পারবেনা, এককোষী এলজিগুলো সহজেই খাওয়া যেত।কিন্তু এই জোড়া-এলজিগুলো সে খেতে পারলোনা। ফলে, বিবর্তন হলো, ২০ প্রজন্ম পরে দেখা গেল, এককোষী এলজি আর নেই, সব এলজি এখন বহুকোষী।ফলে, বেচারা প্রোটিস্টটা আর কাওকে খেতে পারলো না।

 

সুতরাং, পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এককোষী অর্গানিজমরা বিবর্তিত হয়ে বহুকোষী হতে পারে।

 

২০১১ সাল,ঈস্ট নিয়ে গবেষণা হলো। দেখা গেল,একইভাবে মাল্টি-সেলুলার এ বিবর্তিত হওয়ার পর, দেহের একেকটা অংশ একেক কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেয়, আর সেই কাজে দক্ষ হয়ে ওঠে।

 

মানে, যেকোনো প্রাণীর দেহেরই একেকটা অঙ্গ একেকটা কাজ করে, তেমন।
একই বছর আরেকটা গবেষণা হলো,আগের প্রোটিস্ট-এলজি গবেষণার মতোই।তবে, এখানে প্রোটিস্টকে খাওয়ার জন্য এলজির পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াও দেয়া হয়। দেখা গেল, একটা প্রোটিস্ট এলজি খেয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোনো কারণে হজম করতে পারেনি। ফলে এলজিটা তার দেহের ভেতরেই রয়ে গেছে, এমনকি বংশবিস্তারও করেছে। আবার, প্রোটিস্টটা যখন বংশবিস্তার করলো, তার সন্তানের মধ্যেও অর্ধেক এলজি চলে গেল।

 

তারপর, দেখা গেল যে এলজি ওয়ালা প্রোটিস্টটরা অন্যান্য প্রোটিস্টদের চেয়ে বেশিদিন বাঁচে, ভালো ভাবে বাঁচে। খাদ্যাভাবের সময় প্রোটিস্টরা নিজেদের ভেতরের এলজির উৎপাদিত বর্জ্য খেয়ে বেঁচে থাকে। মানে, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কোষ! আমাদের কোষের ভেতরে মাইটোকণ্ড্রিয়ার মতোই!

 

এভাবে, র‍্যান্ডমলিও মাল্টি-সেলুলার অর্গানিজম ডেভেলপ হয়, তারপর তারা কোঅপারেট করলে,বিবর্তন তাদের টিকিয়ে রাখে। আর এভাবেই হয় মেজর ইভোলুশনারি ট্রানজিশন।

 

আমাদের দেহ গঠনে সাধারণভাবে ৩ টা এমন ট্রানজিশন হয়েছে,ফলে আমরা চারটা আলাদা স্তরে ভাগ হয়ে একটা একক জীব হিসেবে বেঁচে আছি। মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতর জিন,কোষের ভেতর মাইটোকন্ড্রিয়া, আর দেহের ভেতরে কোষ।

প্রক্রিয়াটার সুন্দর নাম হলো এন্ডোসিম্বায়োসিস।প্রোক্যারিওট থেকে ইউক্যারিওট কীভাবে আসলো, তা ব্যাখ্যা করে এই এন্ডোসিম্বায়োটিক থিওরি। হ্যা, এটা থিওরিই, মানে প্রমাণিত।

 

আমরা সবাই প্রোক্যারিওট সেল চিনি। এদের আরএনএ,রাইবোজোম,মেমব্রেন আর সাইটোপ্লাজম থাকে।ইউক্যারিওটদের যাবতীয় সব থাকে। একদম প্রাণের সূচনালগ্নের কিছুকাল পরে যথেষ্ট বিবর্তন ঘটে গিয়েছিলো বিভিন্ন রূপের প্রোক্যারিওট তৈরি হওয়ার জন্য, ফলে একেকটা প্রোক্যারিওট একেকটা ক্ষমতা লাভ করে, একেকটা বৈশিষ্ট্য লাভ করে।তো, আমরা তিন ধরনের প্রোক্যারিওট নিয়ে আজকে আলোচনা করবো।
এক ধরনের প্রোক্যারিওট সূর্যের আলোর সাহায্যে শর্করা উৎপাদন করতে পারতো।

 

আরেক ধরনের প্রোক্যারিওট শর্করা ভেঙে এটিপি উৎপাদন করতে পারতো।আরেক ধরনের প্রোক্যারিওট ছিলো আকারে তুলনামূলক বড়, সে নিজের চেয়ে ছোট জীবদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতো।
একদিন, বড় প্রোক্যারিওটটা শর্করা উৎপাদনকারী প্রোক্যারিওটকে খেয়ে ফেললো। কিন্তু, কোনো কারণে হজম করতে পারলো না।

 

ফলে, সেটা সেই বড় প্রোক্যারিওটের ভেতরেই বাস করতে লাগলো, বংশবৃদ্ধি করলো। এভাবে অনেকদিন চললো, অনেক প্রজন্ম পার হলো, এবার শর্করা উৎপাদনকারী প্রোক্যারিওটটা বড় প্রোক্যারিওটের দেহের মধ্যে এমনভাবে মানিয়ে নিলো,যেন এরা দুইটা আলাদা জীব না। একই জীব।

 

এভাবে, আরেকদিন একটা বড় প্রোক্যারিওট,যার মধ্যে শর্করা উৎপাদনকারী প্রোক্যারিওট আগে থেকেই ছিলো, সে একটা এটিপি উৎপাদনকারী প্রোক্যারিওটকে খেয়ে ফেললো।এর সাথেও একই ঘটনা ঘটলো। হজম হলোনা, বংশবৃদ্ধি করলো, দেহের অংশ হয়ে গেল।

 

এবার, বড় প্রোক্যারিওটের দেহে একজন সূর্যালোকের সাহায্যে শর্করা উৎপাদন করে, আরেকজন শর্করা দিয়ে এটিপি উৎপাদন করে। ফলে? সুন্দর একটা কম্বিনেশন হয়ে গেল। বড় প্রোক্যারিওটটার দেহের ভেতরেই শক্তি উৎপাদন সম্ভব হলো। আর সেই শক্তি ব্যাবহার করে বড় প্রোক্যারিওটটা আত্মরক্ষার কাজ করতো।

 

এভাবে, তিনটা একেবারে সরল কোষ মিলে জটিল কোষ উৎপাদন করলো। এন্ডোসিম্বায়োসিস সম্পন্ন হলো। প্রোক্যারিওটা থেকে ইউক্যারিওটার আবির্ভাব হলো।
ওপরে যে শর্করা উৎপাদনকারী আর এটিপি উৎপাদনকারী কোষের কথা বললাম, নিশ্চই বুঝে গেছেন, এরা হলো যথাক্রমে মাইটোকন্ড্রিয়া আর প্লাস্টিডের আদিপিতা। বিবর্তিত হতে হতে এরা বর্তমান রূপে এসেছে। এবার প্রমাণ?

 

মাইটোকন্ড্রিয়া আর প্লাস্টিডের বাইরে দুইটা আবরণ থাকে। ভেতরের আবরণটা বর্তমানে উপস্থিত প্রোক্যারিওটা জগতের প্রাণীদের মতো, আর বাইরের আবরণটা প্রোটিন-লিপিড দিয়ে গঠিত, মানে ইউক্যারিওটাদের মতো। বুঝলেন? এরা আগে স্বতন্ত্র জীব ছিলো, কোষের ভেতরে প্রবেশের সময় কোষের আবরণ এদের চারপাশে জড়িয়ে গিয়েছে।

মাইটোকন্ড্রিয়া আর প্লাস্টিডের বিভাজিত হওয়ার প্রক্রিয়া, এদের নিউক্লিক এসিড, সবই প্রোক্যারিওটিক জীবদের মতো।মানে, এটা সুস্পষ্ট যে, এরা আগে আলাদা জীব ছিলো, পরবর্তীতে ওপরে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় এরা একত্রে বসবাস শুরু করে।

 

এভাবে, এন্ডোসিম্বায়োসিসের মাধ্যমে প্রাণের অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় ধাপটা পাড় হয়ে যায়, চলতে থাকে প্রাণের বিবর্তন। সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে জড়ের সমাবেশ হতে ধাপে ধাপে জটিলতা তৈরি হয়,এই জটিলতার বিবর্তনের ফল এই আমরা। প্রাণ বা প্রাণী বলতে আদও কিছু আছে? এ নিতান্তই ভ্রম।

Some ordinary molecules reacting and interacting and creating complexity to a great extent, an illusion of being alive.That can’t be life………..

 

লিখাঃতাহসিন আহামেদ অমি

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *