বন্যপ্রানী বিলুপ্তির নেপথ্যেঃ ট্রেডিশনাল চায়না মেডিসিন(টিসিএম)

চোখের সামনে একটি প্রজাতির নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শুধুই ঐ প্রজাতিটির কোটি কোটি বছর ধরে চলা জীবন সংগ্রামের ইতিটানা নয়,বরং প্রজাতিটি নিঃশেষ হতে হতে পুরো মানবজাতির গালে কসিয়ে কয়েকটি চড় বসিয়ে দেয়।

১৮ই মার্চ ২০১৮,
পৃথিবী থেকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পথ পাকাপোক্ত হয় উত্তর সাদা গন্ডার প্রজাতিটির।এই প্রজাতির শেষ পুরুষ গন্ডারটি এদিন সুদানে মৃত্যুবরন করে।

এই প্রজাতির বর্তমানে আর দুটো গন্ডার জীবিত আছে যার দুটোই মেয়ে গন্ডার।শুধু এই প্রজাতির গন্ডারই নয়,অন্যান্য প্রজাতির গন্ডার সহ প্রায় পুরো বন্যপ্রানীকূলই আজ হুমকির মুখে।

এর নেপথ্যে রয়েছে,২৫০০বছরের পুরোনো কিছু লোকাচার,বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন চিকিৎসা পদ্ধতি আর কতিপয় বিশাল সংখ্যক এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে বিশ্বাসি জনগোষ্ঠী।

বলছি টিসিএম বা ট্রেডিশনাল চায়না মেডিসিনের কথা যার চিকিৎসা উপাদানের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩৬প্রজাতির প্রধান প্রধান স্তন্যপায়ীর নাম সহ বিপন্ন সামুদ্রিক জীব,এবং উদ্ভীদ।

টিসিএম এর কিছু ভিত্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য আর সম্প্রীতি ঠিক রেখে শরীরকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার ওপর জোর দেয়া হয়।টিসিএম এর ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা হয় যে আমাদের শরীরে বিদ্যমান প্রানশক্তি আর এর বিপরীতে থাকা শক্তির ভারসাম্য নড়চড় হলেই শরীর অসুস্থ হয় আর টিসিএম চিকিৎসা ব্যাবস্থা এই ভারসাম্য বজায় রেখে শরীরকে সুস্থ রাখে।

১৯১০সালে ন্যাশানাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনে আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট আফ্রিকায় থাকা প্রানীদের বর্ননা এভাবে দেন,

“Teems with beasts of the chase, infinite in number and incredible in variety.Holds the mightiest creatures that tread the earth or swim in its rivers.”

রুজভেল্টের বর্ননার সেই প্রানের এই উচ্ছলতা মাত্র ৮০বছরের মাথাতেই অর্ধেকে নেমে আসে কিভাবে?

 

বন্যপ্রানী বিলুপ্তির নেপথ্যেঃ ট্রেডিশনাল চায়না মেডিসিন(টিসিএম)
বাঘ, গন্ডার ও এশিয়ান কালো ভাল্লুক

টিসিএম চিকিৎসা পদ্ধতিতে যেসব উপাদান ব্যাবহার করে যা সত্যিই বিশেষভাবে আমাদের দক্ষিন এশিয়ার মানুষের কাছে অবাক করার মতো।

মানুষের লিঙ্গ, মল থেকে শুরু করে মানুষের নখ, সাপের তেল,ভাল্লুকের পিত্ত,কচ্ছপের খোলস,ভাল্লুকের পিত্ত,গাধার মল,হাতির দাতের অংশ,গন্ডারের শিঙা, জোকের তেল,কুকুরের লিঙ্গ,বিছে,প্যাঙ্গোলিনের স্কেল,হাঙরের পাখনা,হরিনের নাভী,বাঘের লিঙ্গ,ব্লিস্টার বিটল,সেন্টিপিড,সি-হর্স সহ আরো বিভিন্ন প্রানীর ব্যাবহার করা হয় যা বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে।

বর্তমানে টিসিএম এর চাহিদা বাড়তি থাকার টিসিএম এ ব্যাবহৃত প্রানীরা দ্বিগুনেরো বেশি গতিতে বিলুপ্ত হচ্ছে।

১৯৫০ এর দশকে মাও সেতুং চীনকে একত্রিত করার লক্ষ্যে তিনি টিসিএম কে সমর্থন দিয়েছিলেন,যা ততকালীন সময়ে চীনা নাগরিকদের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হতে ব্যাপক সহায়তা করেছিলো।কিন্ত এর বিপরীতে সুদূর আফ্রিকায় প্রানী নিধনের পরিমানও বেড়ে গিয়েছিলো সমান্তরাল ভাবে।

একটি উদাহরনের সাহায্যে হয়তো এটি ভালো ভাবে বোঝানো যাবে,

আফ্রিকান সাভানায় বিশ শতকের শুরুতে প্রায় ১মিলিয়ন কালো গন্ডার ঘুরে বেড়াতো,আর বিশ শতকের শেষে কালো গন্ডারের সংখ্যা এসে দাড়ায় মাত্র ২৩০০তে।

যদিও ১৯৬৬-১৯৭৭সাল পর্যন্ত চলা চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব টিসিএম এর ব্যাবহারকে অনেক তরান্বিত করেছিলো যা সমান্তরালে তরান্বিত করেছিলো নির্বিচারে প্রানী নিধনকে।

শুধুমাত্র টিসিএম কে যদি আমরা প্রানী বিলুপ্তির জন্য দায়ী করি তবে তা নেহাতই ভূল হবে।এখনো প্রতি বছর প্রায় ৩৫০০০আফ্রিকান হাতি নিধন করা হয় শুধু মাত্র তাদের দাতের জন্য।

একটু পেছনে ফিরে তাকালেই দেখা যায় যে আফ্রিকান দেশ কঙ্গোয় বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক কালে প্রায় ৮০হাজারের মতো হাতি নিধন হয়েছিলো শুধুমাত্র শখের বসে কিংবা শৌখিন সামগ্রি তৈরির উপকরন হিসেবে হাতির দাতের জন্যে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারববর্ষে প্রায় ৭৫হাজারের মতো বাঘকে নির্বিচারে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিলো।

যদিও টিসিএম এর জন্য আফ্রিকায় প্রানী নিধন পরিমানে বেড়ে গিয়েছিলো ২০শতকে কিন্ত বলে রাখা ভালো বিশ শতকের পূর্বে এবং বিশ শতকের অর্ধেকেরো বেশি সময় আফ্রিকায় রাজত্ব করেছিলো ইউরোপিয়ানরা,তাই প্রানী বিলুপ্তির অগ্রযাত্রায় দায় ঔপনিবেশিকদেরও রয়েছে,এই সত্য কখনো এড়ানো যাবে না।

বন্যপ্রানী বিলুপ্তির নেপথ্যেঃ ট্রেডিশনাল চায়না মেডিসিন(টিসিএম)
সি এলিফ্যান্ট, এন্টিলোপ ও বাঘ

২০০০সালে ভিয়েতনামে একটি গুজব ছড়ায় যে গন্ডারের শিঙা মেশানো জল নাকি ক্যান্সারের প্রতিষেধক।যা ততকালীন সময়ে এতই আলোড়ন ফেলেছিলো যে ২০১১সাল নাগাত ভিয়েতনামে বিদ্যমান শেষ গন্ডারটিকেও মেরে ফেলা হয়।

সচরাচর টিসিএম এ গন্ডারের শিঙা মেশানো জল গায়ের তাপমাত্রা কমানোর জন্য ব্যাবহার করা হয়।এছাড়াও একে ন্যাচারাল ভায়াগ্রা কিংবা হ্যাংওভার তাড়ানোর জন্য মদের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়। মাও সেতুং এর টিসিএম কে সমর্থন দান,চীনাদের জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধিসহ নানা কারনে ১৯৫০এর পরে টিসিএম এর চাহিদার সাথে সাথে গন্ডারের শিঙার চাহিদা বৃদ্ধি পায়।

১৯৫৫ থেকে ১৯৯৫সালের মধ্যেই ৯৮% কালো গন্ডার শিকারীদের দ্বারা শিকার হয় শুধুমাত্র ক্রমবর্ধমান টিসিএম এর চাহিদা পূরন করার জন্য।যদি সেসময় পশ্চিমা দেশগুলোতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে গন্ডারের শিঙার তৈরি অলংকারের চাহিদা বেড়ে চলেছিলো কিন্ত সে চাহিদা টিসিএম এর চাহিদাকে পার করতে পারে নি।

চায়না ট্রেডিশনাল মেডিসিনে বাঘকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা দেখানো হয়েছে।এর প্রায় শরীরের সব অংশই টিসিএম এ ব্যাবহার করা হয়।ভিন্ন ভিন্ন রোগের জন্য ভিন্ন অংশ ব্যাবহার করা হয়।

যেমন,হাড় ব্যাবহার করা হয় বাত রোগের জন্য,বাঘের মগজ খাওয়া হয় কুড়েমি আর পিম্পল দূর করার জন্য,চোখ খাওয়া হয় ম্যালেরিয়া আর ইপিলিপ্সি দূর করার জন্য। আইইউসিএন( IUCN) বাঘকে রেড লিস্টেড করেছে আর এক গবেষনায় উঠে এসেছে হয়তো আগামী শতাব্দী আসার আগেই আমরা এই প্রানীকে হারিয়ে যেতে দেখবো।

গত শতাব্দীর শুরুতে যেখানে প্রায় ১০০০০০বাঘ ছিলো বর্তমানে সেখানে মাত্র ৩২০০-৫০০০বাঘ সারা পৃথিবীতে বিদ্যমান।বাঘের হাড়ের অবৈধ বানিজ্যের অন্যতম দেশ চীনে ১৯৯৩ সালে বাঘের হাড়ের অবৈধ বানিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়।

২০০৬সালে বন্যপ্রাণী বানিজ্য নিরীক্ষন নেটওয়ার্ক এর সমীক্ষায় দেখা যায় যে চীনের ২২৬টি শহরের প্রায় ৬৩৬৩৩টি মেডিকেল শপের প্রায় ৩%এর ও কম দোকানে বাঘের হাড়ের মজুদ পাওয়া যায় যদিও সংখ্যাটি নিয়ে কিঞ্চির সন্দেহ বিদ্যমান ছিলো কারন ১৯৯৬-৯৭ সালে উত্তর আমেরিকার চীনা মেডিকেল শপ গুলোর প্রায় ৪৩% শপে বাঘের হাড় পাওয়া যায় যদিও এর মধ্যে অনেকগুলো চিতার হাড় বলেও তারা দাবি করেছিলো।

অবাক করার মতো হলেও সত্যি যে বাঘের চাহিদা শুধুই টিসিএম এর ক্ষেত্রেই নয়, বরং ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা সিডনীর মতো বড় বড় শহরগুলোতেও বাঘের হাড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যার দর প্রতি কেজি প্রায় ১৭০-৩৪০ডলার।

তাছাড়া এককাপ বাঘের মলের স্যুপের দাম প্রায় ৩২০মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের সুন্দর বনে কয়েক দশক আগেও বাঘের সংখ্যা যথেষ্ঠ ছিলো তা বর্তমানে নেমে ১৬৪তে।

টিসিএম এ ভাল্লুকের পিত্ত ব্যাবহার করা হয় মাথা ব্যাথাসহ লিভারের অসুস্থতায়। প্রতিবছর চীনে এদের বিশাল চাহিদা থাকে। বৈশ্বিক ভাবে বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতার কারনে বর্তমানে চীনে প্রায় ২০০টি খামারে ৭০০০এর থেকেও বেশি ভাল্লুক পালন করা হয় শুধুমাত্র এদের পিত্তরস সংগ্রহ করার জন্য।

যদিও পালন পদ্ধতি ভাল্লুকদের জন্য এতই কষ্ট দায়ক যে চীনের প্রায় ৭০%শতাংশ মানুষই এমনভাবে ভাল্লুক পালনের বিপক্ষে।আর চাহিদার তুলনায় এত কম সংখ্যক ভাল্লুকের পালন কখনই ভাল্লুক নিধনকে রোধ করতে সমর্থ নয়।

টিসিএম এ হরিনের শিংয়ের ব্যাবহার লক্ষনীয়।আন্টিলোপ জাতীয় হরিনের শিঙা ব্যাবহার করা হয় তীব্র জ্বরের প্রতিকার করার জন্য।

তাছাড়া মাস্ক ডিয়ার কিংবা কস্তরী মৃগের নাভীর ব্যাবহারও টিসিএম এ বিদ্যমান।মাস্ক ডিয়ার হলো একপ্রকার লাজুক প্রকৃতির পুরূষ হরিন যাদের বয়েস ১০হলেই এদের নাভী পরিপক্ক হয়ে সেস্থান থেকে সুগন্ধ নির্গত হয়।

এই সুগন্ধির চাহিদা শুধু যে টিসিএম এর ক্ষেত্রে বিদ্যমান তা নয়,বরং পুরো পৃথিবীব্যাপি এর চাহিদা রয়েছে।এক কিলো কস্তরীর জন্য প্রায় দুই হাজারটি হরিন হত্যা করতে হয়,তাই বোঝাই যাচ্ছে হয়তো মাস্ক ডিয়ার কিংবা আন্টিলোপের মতো হরিনগুলো খুব শিঘ্রই পৃথীবি থেকে বিদেয় নেবে।

তাছাড়া হরিনের লিঙ্গের ওয়াইন এবং রোস্ট টিসিএম ঔষধি হিসেবে খুবই জনপ্রিয়।

প্যাঙ্গোলিন বা বনরুই হলো একমাত্র আশযুক্ত স্তন্যপায়ী প্রানী।বর্তমানে এরা মহা বিপন্ন।টিসিএম এর ক্ষেত্রে এদের স্কেল বা আশের বিশেষ চাহিদা থাকায় এরা আজ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী।

টিসিএম এ এদের স্কেলকে ব্যাবহার করা হয় পুজ,পক্ষাঘাত,মহিলাদের দুগ্ধনিঃসরন সহ আরো বিভিন্ন গাইনোকোলজিকাল সমস্যার উপশমের জন্য।বর্তমানে চায়না এবং ভিয়েতনামে এদের মাংশের বিশেষ চাহিদা রয়েছে।

এটির আটটি প্রজাতির প্রায় সব কটিই বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত।

সাপের ব্যাবহার টিসিএম এ প্রচুর। সাপের তেল বা স্নেক অয়েল বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতে খুবই জনপ্রিয়। জয়েন্টের সমস্যা আর আথ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্য স্নেক অয়েল ব্যাবহার করা হয়

ধারনা করা হয় ১৮৪০সালে ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রেলওয়ে স্থাপনের সময় চায়নার শ্রমিকেরা সাথে করে আমেরিকায় সাপের তেল নিয়ে যায়,যা ততকালীন সময়ে সেখানে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।কিন্ত বর্তমানে এই তেলের অত্যাধিক ব্যাবহার সাপের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলেছে।

সি-হর্স বা সমুদ্র ঘোড়ার ব্যাবহার টিসিএম এ ব্যাপক। সমুদ্র ঘোড়ার বহুমুখী ব্যাবহার রয়েছে।গলায় সংক্রমন,ধমনীতে সংক্রমন,ত্বকের অসুস্থতা,থাইরয়েড ব্যাথি,কিডিনিতে সমস্যাসহ নানা রোগের উপশমক হিসেবে এটি ব্যাবহার হয়।

আফ্রোসেডিয়াক এবং সন্তান জন্ম দানের সুবিধার্থেও একে ব্যাবহার করা হয়।এক সমীক্ষায় দেখাগেছে,তাইওয়ানে প্রায় ২৩টি টিসিএম মেডিসিন শপ থেকে সংগ্রীহিত ৫৮টি সি-হর্সের মধ্যে ৫৮তম সিহর্সের ৮প্রজাতির মধ্যে সাতটিই বিপন্ন।

৩২টি দেশে গড়ে প্রায় ২০০০০০০০টি সিহর্স চাষ করা হয়,কিন্ত তা বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় অতি নগন্য।বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫০০টনের মতো সি-হর্সের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক চাহিদাই চীনের মধ্যে বিদ্যমান যার অধিকাংশই তারা আমদানি করে মেটায়।

১৯৯৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ততকালীন সময়ে সিহর্সের পরিচিত পয়ত্রিশটি প্রজাতির প্রায় অর্ধেকই গায়েব হয়ে গিয়েছিলো।

অবাক করার বিষয় হলো যে এখনো সিহর্সকে আইইউসিএন রেড লিস্টের কোন ক্যাটাগরিতেই যুক্ত করে নি।হয়তো এদের বিলুপ্তিও খুব সামনেই আমরা দেখতে পাবো।

টিসিএম এ হাঙরের পাখনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।ধারনা করা হয় হাঙরের পাখনার দ্বারা তৈরী ঔষধ ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি,শক্তি বৃদ্ধি,হৃদপিন্ডের রোগ প্রতিরোধ,কোলেস্টেরল কমানো,ক্ষুদা বৃদ্ধি,রক্তের বিশুদ্ধতা বৃদ্ধি,বৃক্ক,হাড় ও ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি সহ শরীরের বিভিন্ন অংশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

১৯৯৭সালের দিকে হাঙরের পাখনার স্যুপ এবং টিসিএম এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে হাঙর ফিনিং তথা হাঙরের পাখনা আহরনের পরিমান বৃদ্ধি পায়।

ব্যাপারটা খানিকটা অমানবিক কারন,হাঙর শিকার করার পর এদের পাখনা কেটে রেখে বাকি অংশ সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয় যার ফলে এরা সহজেই অন্যসব সামুদ্রিক শিকারিদের শিকারে পরিনত হয়ে প্রান হারায়।

এক জরিপে দেখা যায় পাখনার জন্য প্রতিবছর প্রায় ৭৩-১০০মিলিয়ন হাঙর শিকার করা হয় যার বাজার মূল্য প্রায় ৫৪০মিলিয়ন-১.২বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত যে হাঙরের মাংশ এবং পাখনার কোন ঔষধি গুন নেই বরং হাঙরের মাংস খেলে মানবদেহে DEMENTIA এবং METAL POISONING এর ঝুকি বাড়ে। হয়তো মানুষের লোভের খড়গের নিচে খুব শিঘ্রই বলি হতে চলেছে আরেকটি প্রাণ।

বন্যপ্রানী বিলুপ্তির নেপথ্যেঃ ট্রেডিশনাল চায়না মেডিসিন(টিসিএম)
সি হর্স, আফ্রিকান হাতি ও মাস্ক ডিয়ার

জোকের ব্যাবহারও টিসিএম এ যথেচ্ছ। শুকনো জোক গুড়ো করে ব্যাবহার করা হয় পেট ব্যাথা কিংবা কোস্টকাঠিন্যের মতো সমস্যা সমাধানের জন্য।তাছাড়া শুকনো জোকের গুড়ো ডিটক্সিফিকেন্ট হিসেবেও ব্যাবহার করা হয়।

তাছাড়া সেন্টিপিটের ব্যাবহারও প্রচুর রয়েছে।গুড়ো করা সেন্টিপিট টিটেনাস,খিচুনি এবং ব্যাথার চিকিৎসায় ব্যাবহার করা হয়।

এছাড়াও উড়ন্ত কাঠবিড়ালির মল,গাধার মল,কচ্ছপের খোলস সহ আরো বিভিন্ন বিপ্নন প্রানীকে ব্যাবহার করা হচ্ছে।

সব চেয়ে ভয়ের কথা হচ্ছে যে,পৃথিবীর প্রানের প্রাচুর্য যে টিসিএম এর কারনে আজ হুমকিতে,সেটাকেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন খোদ চীনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং।

লন্ডন এর EIA(Environmental Investigation Agency) এর ক্যাম্পেইনার এরন ওয়াইট এর মতে,

“বিশ্বব্যাপি TCM কে ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে World Federation of Chinese Medicine Society এর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।”

২০১৬সালে চীনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ টিসিএম কে মেডিকেল সায়েন্সের সর্বক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন ভাবে ব্যাবহারের পরিকল্পনা প্রকাশ করে।

এই লক্ষ্য পূরনেই চীন বহু আকাঙখিত আরেকটি প্রজেক্ট ট্রিলিয়ন ডলার বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (সিল্ক রোড) প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয়।

বর্তমানে টিসিএম এর বাজারমূল্য প্রায় ১৩০বিলিয়ন মার্কিন ডলার যার মধ্যে ২৯৫মিলিয়ন মার্কিন ডলার চীন বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক পন্য রপ্তানি করে আয় করে প্রতিবছর।

কিন্ত টিসিএম এর এই বৈশ্বিক বানিজ্য বন্য প্রানীদের জন্য মৃত্যুস্বরূপ কেননা এটি তাদের বন্যজীবন কেড়ে নেয়,কখনোবা কেড়ে নেয় তাদের প্রান শুধুমাত্র প্রেসক্রিপশনের উপাদান তৈরির জন্য।

যদিওবা চীন সরকার বিভিন্ন সময় বন্যপ্রাণী রক্ষার্থে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলো তবে প্রতিবারই প্রতিটি উদ্যোগের শেষে একটি প্রশ্ন বোধক চিহ্ন যুক্ত হয়েছিলো।

যেমনটা হয়েছিলো ১৯৯০সালে যখন চীনা সরকার টিসিএম এ বাঘের হাড় এবং গন্ডারের শিং এর ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আরোপের কিছুদিন পরই চীন সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চায় কিন্ত আন্তর্জাতিক চাপের কারনে তা করা সম্ভব হয় নি।

২০১৮ সালে World Federation of chinese medicine society, “World Congress of Chinese Medicine ” এ টিসিএম এ বাঘের হাড় এবং গন্ডারের শিঙা ব্যাবহার না করাকে নিরুৎসাহিত করে।

একই বছরের ১৮ই মে ডব্লিউ এইচও টিসিএম কে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বকৃতি দেয় যা টিসিএমকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার পক্ষে যায়। যদিও পরে ডব্লিউএইচও এর পক্ষ থেকে বলা হয় যে টিসিএম কে স্বীকৃতি দেয়ার মানে এই নয় যে সেখানে বাঘের হাড় এবং গন্ডারের শিঙা ব্যাবহার করবে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই মন্তব্য বন্যপ্রান রক্ষায় কতখানী গ্রহন্যোযোগ্য তা বলা বাহুল্য।

বলে রাখা ভালো করোনা ভাইরাস ইস্যুতে ইউএসএ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় অনুদান দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে একমাত্র তাদের এই চীনঘেঁষা নীতির কারনে।

বিভিন্ন আমেরিকান পত্রপত্রিকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান মহাপরিচালক এর দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে,বলা হচ্ছে ইথিওপিয়া তথা সংস্থাটির মহাপরিচালকের নিজ দেশে চীনকে ইনভেস্ট করাতেই বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা এমন সব প্রশ্নবোধক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

EIA এর ক্যাম্পেইনার এরন ওয়াইট এর মতে,

” নিষ্ঠুর হলেও সত্য যে,টিসিএম এ ব্যাবহৃত বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীর ব্যাবহারে চীন সরকারের নিষেধাজ্ঞা শুধু মাত্র কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ।”

কালোবাজারের ব্যাবসায়ের দিক থেকে বন্যপ্রাণী পাচারের ব্যাবসা চতুর্থ স্থানে রয়েছে। UNODC এর গবেষণায় উঠে এসেছে এর প্রধান কারন হলো টিসিএম।

জাতিসংঘের এক গবেষনায় ঊঠে এসেছে যদি এমন পরিস্থিতি চলতে থাকে তবে,আর বেশি দেরী নেই।এই শতকের শেষ দিকেই হয়তো আমাদের দেখতে হবে সকল বন্য প্রানের বিলুপ্তি।

কতিপয় স্বার্থান্বেষি,অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের হেয়ালিপনায় হতো হারিয়ে যাবে কোটি কোটি বছর ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া হাজারো প্রজাতি।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে,সেই অপেক্ষায় রইলাম।
হয়তো মানসিকতা,পাল্টাবে।

লিখাঃ প্রীতম মজুমদার,

তথ্যসংগ্রহঃ সাদিয়া আফরিন মীম, প্রীতম মজুমদার

শিক্ষার্থী, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ।

তথ্যসূত্রঃhttps://www.pharmaceutical-journal.com/opinion/blogs/the-history-of-snake-oil/20067691.blog?firstPass=false

ttps://www.google.com/amp/s/alyouneedisbiology.wordpress.com/2016/07/14/threatened-species-by-traditional-chinese-medicine/amp/

https://journals.plos.org/plosgenetics/article?id=10.1371/journal.pgen.1002657,

https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0145901

https://blogs.scientificamerican.com/extinction-countdown/how-the-western-black-rhino-went-extinct/

https://www.scientificamerican.com/article/the-hard-truth-about-the-rhino-horn-aphrodisiac-market/
https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S1021949813000434#!

https://www.bbc.com/news/world-africa-43468066

https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S0378874112008306

https://www.google.com/amp/s/allyouneedisbiology.wordpress.com/2016/07/14/threatened-species-by-traditional-chinese-medicine/amp/

যোগ দিন  Engineers Diary Science Club

Invest in Social
Pritom Majumder

Pritom Majumder

A lil creation of the UNIVERSE

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *