করোনা বলদদের গল্প – ১: জার্মানি

গতকাল শনিবার, ১লা আগস্ট জার্মানির বার্লিনে এক বিরাট মিছিল বের হয়েছিল। মিছিলের দাবি ছিল – লকডাউন তুলে নিতে হবে। কারন, করোনাভাইরাস বিপজ্জনক কিছু নয়, সুতরাং, কোনো লকডাউন বা ওষুধ বা ভ্যাক্সিনের দরকার নাই ।

কমপক্ষে ১৭ হাজার মানুষ এই বিরাট মিছিলে অংশ নেয়,যাদের মধ্যে প্রায় কারোরই মুখে মাস্ক ছিল না।

মিছিল থেকে তারা স্লোগান গিয়েছিল, Masks make us slave ( মাস্ক আমাদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখছে), Corona, false alarm ( করোনা, ভুয়া) , “we’re here and we’re loud, because we are being robbed of our freedom.” ( আমরা এখানে চিতকার করছি, কারন আমাদের স্বাধীনতা ডাকাতি করে নিয়ে গেছে)

এছাড়া তাদের প্লাকার্ডে যা লেখা ছিল, সেগুলা ইংরেজি অনুবাদ করলে হয় “we are being forced to wear a muzzle”( মাজল মানে হচ্ছে গরুর মুখের ঠুলি) কিংবা “natural defence instead of vaccination.”

গত পহেলা আগস্টকে তারা End of Pandemic: Freedom Day বলে ঘোষনা করেছিল। ফ্রিডম ডে পালন করতে তারা দলবেধে রাস্তায় নেমে পড়েছিল।

আন্দোলনকারীদের মধ্যে মূলত ৩ টা গ্রুপ ছিলঃ

১. কনস্পাইরেসি থিওরিস্ট গ্রুপ। এরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র খোজে, এবং বিভিন্ন হিসাব নিকাশ করে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলে সেগুলা সম্পর্কে মানুষকে জানায় ( গুজব ছড়ায়)। যেমন – একটা গুজব বলি। “করোনায় কোনো বিপদ নেই, জাস্ট সর্দি কাশি।

সরকার মানুষকে ইচ্ছা করে ঘরে আটকে রাখছে যেন কলকারখানা না চলে,উতপাদন কম হয়। ওদিক দিক দিয়ে চীন বেশি বেশি উতপাদন করে এগিয়ে যাবে। এই সরকার হল চীনের দালাল সরকার। চীনের সাথে হাত মিলিয়ে দেশে করোনার গুজব ছড়াচ্ছে”।

২. এরা হল Anti vaccination Campaign গ্রুপ ( ছোট করে – anti vaxxers) এরা বলে, ভ্যাক্সিন নিলে মানুষ অটিস্টিক হয়ে যায়। আরো অনেক রোগ বালাই হয়।

ভ্যাক্সিন নেওয়া যাবে না। কৃত্রিম ওষুধ যত কম খাওয়া যায়,ততই ভাল। মাস্ক ও পরা যাবেনা। মাস্ক পরলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

৩. এই গ্রুপে আছে ডানপন্থী কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। যেমন- AfD কিংবা Pegida. এরা তাদের দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারনে জার্মান সরকারের দেওয়া লকডাউনের বিরোধীতা করে মিছিলে নেমে এসেছে।

তারা বলছে, লকডাউন দিলে অর্থনৈতিক মন্দা হবে। মানুষের স্বাধীনতা লংঘন করে সরকার সবাইকে বাধ্যতামূলক ভাবে ঘরে থাকার আদেশ দিতে পারে না।

AfD ছাড়াও ফাকফোকর দিয়ে বর্নবাদী দলগুলো কিংবা নিও নাজি পার্টির নেতাকর্মীরা নামে বেনামে ঢুকে পড়ছে এই আন্দোলনে।

জার্মান সরকারের এক মন্ত্রী, Saskia Esken এদেরকে Covidioits বলে উল্লেখ করেছেন । শব্দটা অবশ্য টুইটারে গত কয়েক মাস ধরেই ঘুরছে। Covid + idiot= Covidiot.

ধীরে ধীরে পপুলার হচ্ছে কোভিডিয়ট শব্দটা। বাংলায় কি অনুবাদ হতে পারে এর? করোনা বলদা? কভিড ভোদাই?আপনি একটা নাম কমেন্ট করুন তো।

এখন পর্যন্ত জার্মানি কভিড মোকাবেলায় খুব ভালভাবে কাজ করছিল। মাত্র ৯,০০০ মৃত্য হয়েছে এখন পর্যন্ত। সেখানে ইউরোপের অন্যান্য দেশের অবস্থা ভয়াবহ।

ইংল্যান্ডে ৪৬ হাজার, ইটালিতে ৩৫ হাজার, স্পেনে ২৬ হাজার মারা গেছে। অনেকে আশংকা করছেন , কভিড ইডিয়টস দের এই মিছিলের পরে জার্মানির অবস্থা খারাপ হবে । কয়েক সপ্তাহ পরেই সিচুয়েশন টা বোঝা যাবে আশা করি।

কিছুদিন আগে একটা লিস্ট বানিয়েছিলাম –ভ্যাক্সিনের বিরোধীতা করছেন যারা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ডাক্তার,পলিটিশিয়ান,সেলিব্রেটি,ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কনস্পাইরেসি থিওরিস্ট, অলটারনেটিভ মেডিসিন এর দালাল সহ অনেকে বিভিন্ন সময়ে ভ্যাক্সিনের বিরোধীতা করেছে।

করোনা কালে এই Anti vaxxer দের সম্ভবত সবচেয়ে বড় ডেমোনেস্ট্রেশন হয়ে গেল কাল।

(লিস্ট লিংক)

মনে রাখবেন, অনেক মানুষ কোনো একটা কথা বললেই সেটা সঠিক হয়ে যায়না। জিওর্দানো ব্রুনো বিশ্বের সকল মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজে হিসাব করে বলেছিলেন, পৃথিবী স্থির নয়, পৃথিবী ঘূর্ননশীল ।

মেজরিটির বিশ্বাসের কারনে কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্নন থেমে যায়নি।

এ্যারিস্টার্কাস বিশ্বের সবার প্রচলিত বিশ্বাসের বিপক্ষে গিয়ে তার পর্যবেক্ষন হিসাব করে বলেছিলেন, পৃথিবী ফ্লাট নয়, গোল। বিশ্বের মানুষরা যা ই বিশ্বাস করুক না কেন, গোল পৃথিবী গোল ই থাকবে, সমতল হবে না।

ভ্যাক্সিন, কিংবা মূলধারার চিকিতসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ১৭ হাজার মানুষ যা ই বিশ্বাস করুক না কেন, সত্য চেঞ্জ হবেনা।

বেশি মানুষ যা বিশ্বাস করে, সেটাই সব সময় সঠিক নয়। বরং মাইনরিটি মতামত ও সঠিক হতে পারে।

ইভেন এমন ও হতে পারে, সঠিক এর পক্ষে কেউই নেই। একদম জিরো জনমত।

গ্যালিলিও,ব্রুনো বা কোপারনিকাস এর আগে কেউই ভাবেনি যে পৃথিবী ঘুরতেছে। সবাই ভেবেছিল, পৃথিবী স্থির। কিন্তু মানুষের বিশ্বাসের কারনে পৃথিবীর ঘূর্নন কিন্তু বন্ধ থাকেনি ।

মানুষ বিশ্বাস করুক না করুক, পৃথিবী ঘুরবেই, করোনাভাইরাস তার আক্রমন চালিয়ে যাবেই। আমাদের উচিত, মূলধারার বিশেষজ্ঞ দের মতামক্ত শোনা। কোনো কনস্পাইরেসি থিওরিস্ট বা এ্যান্টি ভ্যাক্সারের কথায় কান দেওয়া উচিত হবেনা।

Invest in Social

2 thoughts on “করোনা বলদদের গল্প – ১: জার্মানি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *