ভন্ড চুমু বাবাদের চুম্মনগল্পঃচুমু যখন সহস্ররোগের মহাষৌধ

চুমু দিয়েই কি পীর-ফকির-সাধু সন্যাসীরা অসুখ বিসুখ সারিয়ে দিতে পারে ?

 

তেল পড়া, পানি পড়া খুবই কমন। এর বাইরে কিছু কিছু ‘বাবা’ আরো অদ্ভূত উপায়ে রোগ সারানোর দাবি করে।

 

যেমন- ভারতের মধ্যপ্রেদেশের রতলাম জেলার নয়াপুরা এলাকায় এক কিসিং বাবা চুমু দিয়েই রোগ সারাত। যে কোনো রোগের জন্য তার একটাই সলুশন ছিল- চুমু।

 

করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরে ‘আসলাম’ নামের এই বাবা বিপুল উতসাহ উদ্দীপনা নিয়ে চুমু দিয়েই সব করোনা রোগীর রোগ সারানো শুরু করেছিল।

 

তবে তার চুমুতে কাজ হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে এক করোনা রোগীকে চুমু খেয়ে বাবার নিজেরই করোনায় ধরে। সেই করোনায় সে মারাও যায় গত ৪ঠা জুন।

 

বাবার মৃত্যুর পর তাকে চুমু খাওয়া ভক্তরাও ধরা খায়। অনেক সূস্থ ভক্তও নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয় কিসিং বাবার চুমু থেকে । মধ্যপ্রদেশের করোনা সংক্রমনের একটা বড় উৎস ছিল এই কিসিং বাবা।(সোর্স)

 

ভারতের আসামের মারিগাও জেলার ভরাল্টুপ গ্রামে আশ্রম খুলেছিল রামপ্রকাশ চৌহান। সেখানে সে চুমু দিয়ে মেয়েদের সব রোগ সারাত। স্থানীয় অসমোয় ভাষায় সে ‘চুমা বাবা’ নামে পরিচিত হয়েছি।।

 

নিজেকে বিষ্ণুর অবতার বলে দাবি করত সে। দাবি করত, বিষ্ণুর মহান কৃপায় তার ‘চমৎকারী চুম্বনে’ নারীদের শারীরিক-মানসিক সব রোগ সেরে যায়।

 

ছেলেদের কোনো রোগের চিকিৎসা সে করত না। তার দাবি- দেবতা তাকে শুধু মেয়েদের চিকিৎসা করার ক্ষমতা দিয়েছে। ছেলেদের চিকিৎসার ক্ষমতা দেয়নি।

 

২০১৮ সালের আগস্ট মাসে পুলিশ এই বাবাকে গ্রেফতার করে।(সোর্স)(সোর্স)(সোর্স)

 

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কডাপ্পা জেলার আয়াপ্পা মন্দিরে ছিল আরেক কিসিং বাবার আস্তানা । এই বাবা মেয়েদেরকে চুমু দিয়েই সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক রোগ সারিয়ে দিত।

 

ছেলেরা কোনো সমস্যা নিয়ে আসলে অবশ্য তাদেরকে চুমু দিত না । ছেলেদেরকে শুধু মাত্র মন্ত্র পড়া একটি লেবু দিয়েই বিদায় করে দিত ।

 

২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পুলিশ ওই মন্দির থেকে বাবাকে গ্রেফতার করে।(সোর্স)(সোর্স)

 

‘বাবা’ দের পানি পড়া বা অন্যান্য রোগ সারানোর পেছনের টেকনোলজির নাম placebo effect.

 

প্লাসিবো ল্যাটিন শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে- I shall Please, অর্থাৎ, ব্যাপারটা সন্তুষ্টির সাথে জড়িত।

 

রোগী যদি কোন নির্দিষ্ট ডাক্তার বা নির্দিষ্ট কোনো চিকিতসায় গভীর আস্থা রাখে, তাহলে সেই ওষুধ দেওয়া হলে সে মানসিকভাবে বেশ চাংগা হয়। ফলে সাময়িকভাবে তার ব্যথাজনিত রোগগুলা (জ্বর,মাথাব্যথা,পেটব্যথা, পিরিয়ডের ব্যথা ইত্যাদি) উপশম যায়।

 

তবে প্লাসিবোতে আসল রোগ জীবানু কখনো মরে না।

 

সম্ভবত ভণ্ড সাধু-সন্ন্যাসীরা অনেক আগে থেকেই প্লাসিবোর ব্যবহার জানতো। প্লাসিবো ব্যবহার করেই তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে পানি পড়া বা তেল পড়া নিয়ে ব্যবসা করত।

 

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ এর লালসালু উপন্যাসের কথা বলতে পারি। তিনি জানতেন যে গ্রামে কোনো পুরোনো কবর নেই, তারপরেও জোর গলায় বললেন, “গ্রামের কোনায় মোদাচ্ছের পীরের মাজার রয়েছে। স্বপ্নে মোদাচ্ছের পীর আমাকে দেখা দিয়ে বলেছেন যে আমার কবর বাঁধাই করে এখানে মাজার বানাও”।

 

সেই কথিত স্বপ্ন অনুযায়ী মজিদ সেখানে মাজারের ব্যবসা গড়ে তুলল। গ্রামের মানুষ তাকে বিশ্বাস করা শুরু করল। দূর-দূরান্তের মানুষ তাদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে মজিদের কাছে আসতো। মজিদও মাজারের উছিলায় পানি পড়া দিতো, সেই পানি পড়া খেয়ে সবার হালকাপাতলা রোগগুলো ভালো হয়ে যেত। তবে সিরিয়াস রোগগুলো পানি পড়া দিয়ে মজিদ সারাতে পারত না। যেমন: বন্ধ্যা মেয়েদের সন্তান এনে দিতে পারত না মজিদের প্লাসিবো পানি পড়া।

 

ভণ্ড ধর্মগুরুরা যখন থেকেই শুরু করুক না কেন, বিজ্ঞানীরা এই বিদ্যার খোঁজ পেয়েছেন ষোড়শ শতাব্দীতে। ওই সময় প্রচুর আছর হওয়া (possessed) রোগীর সন্ধান পাওয়া যেত। খৃষ্টান পুরোহিতরা বাইবেল, ক্রুশ, আর হোলি ওয়াটারের সাহায্যে আছর হওয়া মানুষদের দেহ থেকে শয়তান তাড়াতেন।

 

কিছু যুক্তিবাদী লোক আছর হওয়া লোকদের সামনে ভুয়া ক্রুস, ভুয়া বাইবেল আর ভুয়া হোলি ওয়াটার এনে জিন ঝাড়া শুরু করল। দেখা গেল, রোগীদের ঘাড় থেকে জিন বা ভূত চলে যাচ্ছে, রোগীরা সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।

 

এখান থেকে ওই বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করলেন যে ক্রুশ, বাইবেল, কিংবা হোলি ওয়াটার এর কোনো ভূমিকা নেই জিন তাড়ানোয়। পেচ্ছাপের নোংরা পানি, অশ্লীল পর্নগ্রাফিক বই, কিংবা বাঁকাত্যাড়া যে কোনো লাঠি দিয়েই যদি রোগীর মনে সেই আমেজ বা অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারি, তাহলে তার ঘাড় থেকে জিন বা শয়তান চলে যাবে।

 

(জানিয়ে রাখি, এই আছরগুলো মূলত হিস্টেরিয়া কিংবা সিজোফ্রেনিয়া রোগ। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে এদের খুব সহজেই চিকিৎসা সম্ভব )

 

কোনো সাধুবাবার কাছে কেউ যদি গভীর বিশ্বাস নিয়ে কোনো রোগ সারানোর জন্য আসে, সেক্ষেত্রে সাধু বাবার পানি পড়া, কিংবা তার মন্ত্র পড়ে ফু দেওয়া, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াতেই রোগী অনেক রিলাক্সড ফিল করে। সাময়িকভাবে তার ব্যথা বেদনা কম হচ্ছে বলে মনে হয়। তবে ওই মুহুর্তে যদি রোগীর রোগটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, তার রোগ একটুও কমেনি , বা শরীরের রোগ জীবানু কমেনি।

 

একটা উদাহরন দেই। ডায়াবেটিস রোগটা খুব সহজেই মাপা যায়। গ্লুকোমিটার নামের একটা ছোট মেশিন দিয়ে রোগী সহজে মাপতে পারে, তার রক্তে ডায়বেটিসের/ব্লাড সুগারের পরিমান এখন কেমন। অনেক ডায়বেটিস রোগী নিয়মিতভাবে ঘুমের আগে, ঘুমের পরে, খাওয়ার আগে ,খাওয়ার পরে ডায়বেটিস মেপে দেখেন। সাধু বাবার ফু দেওয়ার আগে এবং পরে গ্লুকোমিটার দিয়ে ডায়বেটিস চেক করলে নিশ্চিত প্রমান পাওয়া যাবে , রক্তে ব্লাড সুগার কমেছে নাকি একই রয়েছে !!!

 

ফু দিয়ে রক্তে ব্লাড সুগার কমানোর ক্ষমতা নাই সাধুবাবাদের । চুমু দিয়ে করোনার জীবাণু ধ্বংশ করতে পারে না তারা । তবে তাদের মুখের কথায় বা পানি পড়ায়, বা ফু দিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াতে মানসিক শান্তি পায় ভক্তরা। প্লাসিবো ইফেক্টের কারনে রোগী একটু সূস্থ অনুভব করে । প্লাসিবোর ঝড়ে বক মরে , আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে।

 

 

বর্তমানে চিকিতসাবিজ্ঞানের অনেক জায়গায় প্লাসিবো ইফেক্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। করোনার যে অষুধ বা ভ্যাক্সিনগুলো তৈরি হচ্ছে , সেগুলা ট্রায়াল করা হচ্ছে ডাবল প্লাসিবো পদ্ধতিতে। অর্থাৎ ১০০% ভলান্টিয়ারের মধ্যে ৫০% এর শরীরে আসল ভ্যাক্সিনটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, আর বাকি ৫০% এর শরীরে কোনো একটা প্লাসিবো (নরমাল ডিসটিল ওয়াটার বা কিছু এটা ) দেওয়া হচ্ছে।

 

তারপরে অবজার্ভ করা হচ্ছে, কে কে মানসিকভাবে ভাল ফিল করতেছে,কার কার সাইড ইফেক্ট হচ্ছে, কার শরীরের অভ্যন্তরে রোগ জীবানূ মরতেছে, কার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তেছে ইত্যাদি।

(রেফারেন্স) (রেফারেন্স) (রেফারেন্স)

 

 

কিছু কিছু ফকির বা সাধুবাবা প্লাসিবো ইফেক্টের এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবং মানুষের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে । মজিদের মত শুধু টাকা পয়সা আয় করাই নয়, আরো অনেকভাবেই তারা মানুষের সরলতার সুযোগ নিচ্ছে। ফু দেওয়ার উছিলায়, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার উছিলায় ,অনেকভাবেই তারা সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট করে। আলোচ্য চুমু বাবাদের ক্ষেত্রে তো আরো সরাসরিই সেই ঘটনা দেখা গেল।

 

এই সকল ক্ষেত্রে, ভিক্টিমরা বাবাদের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই বলতে পারেনা। বাবার অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস তাকে বাধা দেয়।

 

সাম্প্রতিক ধর্ষন বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সময়ে অনেক ধর্ষণ এর খবর আমরা জানতে পারছি। জানা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিক্টিমরা অনেক সময়েই চুপ করে থাকে, কারন অপরাধীরা এলাকায় প্রভাবশালী। যদি ভিক্টিম পুলিশের কাছে মামলা করতে যায়, তাহলে অপরাধীরা ওই ভিক্টিমের আরো ক্ষতি করতে পারে।

 

সাধুবাবাদের ক্ষেত্রেও একই কথা। বাবারা যেহেতু দাবি করে, তাদের অলৌকিক ক্ষমতা আছে, তাদের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক আছে, ( যেমন -আসামের রামপ্রকাশ চৌহান দাবি করেছিল, সে বিষ্ণুর অবতার) সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হবে । তার আরো ক্ষতি হবে। বাবা হয়তো কোনো একটা অভিশাপ দিয়ে, বদদোয়া দিয়ে, বাণ মেরে তার রো বড় কোনো ক্ষতি করবে !

 

এই ভয়ের কারনে ভিক্টিমরা এসব সাধুবাবাদের সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট গুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়।

 

সাধুবাবাদের টেকনোলজিগুলাতে কোনো উপকার যে হয়না, তার প্রমান তো দেখলেনই। আসামের আসলাম বাবা কিস দিয়ে করোনা সারাতে গিয়ে নিজেই করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। সুতরাং এই বাবাদের কাছে রোগ সারাতে গেলে কোনো উপকারই হবেনা। বরং টাকা পয়সা যাবে, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে পারেন , আরো অনেক ক্ষতি হতে পারে। নিজে সচেতন হোন, অন্যকেও এসব বাবাদের সম্পর্কে সচেতন করুন।

 

লিখাঃজহিরুল ইসলাম

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *