গ্লোবের ভ্যাক্সিন নিয়ে আবারো অতিরঞ্জন

মিডিয়ায় গ্লোবের ভ্যাক্সিন নিয়ে অতিরঞ্জন নতুন নয়। বিজ্ঞান সাংবাদিকের ঘাটতিতে অনেকসময় ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সংবাদ পরিবেশন আমরা দেখতে পাই।

কয়েকদিন আগেই গ্লোবের ভ্যাক্সিন পিয়ার রিভিউড জার্নালে এপ্রুভ হয়েছিলো বলে হইচই হয়েছিলো।

অথচ ব্যাপারটা ছিলো, তাদের গবেষণাপত্র একটি প্রি প্রিন্টেড আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছিলো।

নিজেদের গবেষণার কাজ একটা জায়গায় রেখে দেয়া, যাতে সেটা অন্যদের জানানো যায় এবং যেকেউ তা নিয়ে কাজ করতে পারবে।

এখানে করা কাজটা সঠিক কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটা শুধুমাত্র একটা সংরক্ষণের জায়গা। যেমনটা স্বাভাবিকভাবে আমরা গুগল ড্রাইভে বিভিন্ন ফাইল রেখে শেয়ার করি।

তাদের ঘটনাটা সহজভাবে বললে এভাবে বলা যায়-

ধরা যাক, আমি আমার অনার্স থিসিস সম্পন্ন করলাম। এরপর সেটা জমা দেয়ার জন্য স্যারের কাছে গেলাম। স্যার রুমে না থাকায় তা স্যারের পিয়নের কাছে দিয়ে আসলাম। আর বাইরে এসে সবাইকে আনন্দে বললাম আমাদের থিসিস কম্পলিট!

অথচ স্যার যখন এই পেপার পড়বেন, তখন তিনি তা রিজেক্ট করে আবার করতে বলতে পারেন, কিংবা কিছু সংশোধনী দিতে পারেন। আবার পুরোটা ঠিক আছে বলে গ্রহনও করতে পারেন।

কিন্তু সেটা হওয়ার আগেই আমি সবাইকে বলতে পারিনা যে তা গৃহীত হয়েছে এবং লাইব্রেরিতে রাখার জন্য অনুমতি দিয়েছেন।

অথচ ড. আসিফের স্ট্যাটাসে দেখা যাচ্ছে বায়ো আর্কাইভ তা পাবলিশ করে বলে তিনি আনন্দ প্রকাশ করছেন, যা মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে পেপার একচেপ্টেড হিসেবে!

ড. আসিফ মাহমুদ এর স্ট্যাটাস

সেবার তিনি যেমন অতিরঞ্জন করেছেন, সাংবাদিকরা সেটাকে করেছে আরো বেশি।

এবার গ্লোব বায়োফার্মার প্রধান ড. কাকন নাগও একই কাজ করলেন। সে প্রসঙ্গে মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন বলেন –

“বিজ্ঞানী হিসেবেও বাংলাদেশের মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে থাকেন যা মেইনট্রিম মিডিয়াতে ফলাও করে গর্ব করা হয়!- শুধু শুধু সাংবাদিক এবং আর মিডিয়াকে দিয়ে লাভ কি।

তার একটি নমুনা-

“It’s a matter of immense pride for all Bangladeshis to have the Globe vaccine listed on the WHO website. Because the name that came is Globe Biotech Limited, Bangladesh. This is the first time we have seen the name of Bangladesh in the WHO list for the discovery of the vaccine.”

Dr. Kakon Nag Statement: Source- TBS News

এর আগে গ্লোবের পক্ষ থেকে একটি নোটিশ গনমাধ্যমে পাঠানো হয়।

গ্লোব বায়োফার্মার প্রেস বিজ্ঞপ্তি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট তালিকায় গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের আবিষ্কৃত তিনটি ভ্যাকসিনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রুপ অব কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ ও গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ড. কাকন নাগ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানায়, গত ১৫ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গ্লোব বায়োটেকের আবিষ্কার করা তিনটি ভ্যাকসিনকে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

গ্লোবের ভ্যাকসিনের নাম ব্যানকোভিড। ভ্যাকসিন তিনটি হলো, D614G Variant mRNA vaccine, DNA plasmid vaccine এবং Adenovirus Type-5 Vector Vaccine।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেক-ই বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাদের সর্বোচ্চ তিনটি ভ্যাকসিনের নাম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের তালিকাতে রয়েছে।

সে নোটিশকে উদ্ধৃত করে পত্রিকাগুলো এটাকে গর্বের ব্যাপার হিসেবে প্রচার করে এবং জানায় – হু এটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

নোটিশটির শেষে গৌরবোজ্জ্বল সংবাদ বলা হয়েছে, যদিও এটাতে গৌরবের কিছু নেই।

এটা একটা লিস্ট, যেখানে সারাবিশ্বে কে কী নিয়ে কাজ করছে তা উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ১০ম দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো।

এর সাথে স্বীকৃতি টাইপ কোনো ব্যাপার নেই

 

ডিবিসিঢাকা ট্রিবিউন শিরোনাম

সময় নিউজ জানায় –

“গ্লোব বায়োটেকের রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান ডা. আসিফ মাহমুদ গত ১২ আগস্ট গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাতকারে ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বাজারে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে আসার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেন।
তার এই আশাবাদ প্রকাশের একমাস পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রি-ক্লিনিক্যাল টেস্টের তালিকাভুক্ত করলো।
প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তালিকায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজের ভ্যাকসিনসহ ১৫৬টি কোম্পানি রয়েছে।”
ড. আসিফ মাহমুদ এর বক্তব্য

এখানে তিনি বলেছেন স্বীকৃতি দেয়ার কথা।

বাস্তবতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওবেসসাইটের ক্যান্ডিডেট ভ্যাক্সিন ল্যান্ডস্কেপ ডকুমেন্টের প্রতি পাতায় একটি ডিসক্লেইমার দেয়া আছে যাতে বলা হয়েছে এরা শুধুমাত্র কয়েকটি তথ্য ভ্যারিফাই করে নাম উঠায়। এগুলো হচ্ছে- ক্যান্ডিডেট ভ্যাক্সিনের টাইপ, দেশ, ডোজ, কোন স্টেইজে আছে।

এর সাথে কোন অনুমোদন বা সন্মান জড়িত হওয়ার প্রশ্ন নেই। আমি সেই ডিসক্লেইমার হুবুহু তুলে দিলাম-

“Inclusion of any particular product or entity in any of these landscape documents does not constitute, and— shall not be deemed or construed as, any approval or endorsement by WHO— of such product or entity (or any of its businesses or activities).

While WHO takes reasonable steps to verify the accuracy of the information presented in these landscape documents (i.e only a few info- vaccine type, company name, county of origin, dose and stage of development)

— WHO does not make any (and hereby disclaims all)— representations and warranties regarding the accuracy, completeness, fitness for a particular purpose (including any of the aforementioned purposes), quality, safety, efficacy, merchantability and/or non-infringement of any information provided in these landscape documents and/or of any of the products referenced therein.”

পুরো ডিসক্লেইমার এর ভাবানুবাদ – ” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেবলমাত্র ২০১৯-২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারী সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের খাতিরে এই তালিকাটি প্রস্তুত করেছে। এই তালিকায় কোন পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো ধরনের অনুমতি বা স্বীকৃতি হিসেবে মনে করার কোনো কারণ নেই।

বরং উক্ত তালিকায় দেয়া তথ্যগুলোকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিছু যৌক্তিক ধাপে যাচাই করলেও উল্লেখিত পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের সঠিকতা, সম্পূর্ণতা, নির্দিষ্ট কাজের (উপরে উল্লেখিত) সক্ষমতা, মান, নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, বাণিজ্যিকতা, অথবা প্রদত্ত তথ্যের অবিকৃতির ব্যাপারে কোন প্রতিনিধিত্ব বা নিশ্চয়তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেয় না।

এছাড়াও উক্ত তালিকায় উল্লেখিত পণ্যসমূহের ক্রয়বিক্রয় এবং বন্টনের কারণে কোনো ধরনের ক্ষতি যেমন- মৃত্যু, পঙ্গুত্ব, শারিরীক ক্ষতি, কষ্ট, বা অন্যান্য ভোগান্তি ইত্যাদি হয়ে থাকলে সেসবের দায়-দায়িত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটের উপরের লিংকে পিডিএফ ফর্মেটে একটি ফাইল দেয়া রয়েছে। মোট এগারো পৃষ্ঠার সেই ফাইলে দুটি ভাগে “candidate vaccines in clinical evaluation” এবং “candidate vaccines in preclinical evaluation” শিরোনামে মোটি ১৯৮টি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের তালিকা দেয়া রয়েছে।

এর মধ্যে ১৫৬টি preclinical evaluation পর্যায়ে এবং ৪২টি clinical evaluation এর পর্যায়ে রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

preclinical evaluation পর্যায়ে থাকা ১৫৬টি ক্যান্ডিডেটের মধ্যে বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেকের তিনটি ক্যান্ডিডেটও রয়েছে।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন তথ্যও রয়েছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই ১৯৮টি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের তালিকায় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেকই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার একার তিনটি ক্যান্ডিডেট রয়েছে।

কিন্তু এই তথ্যটি ভুল। কারণ, তালিকায় preclinical evaluation পর্যায়ে মিশরের একটি প্রতিষ্ঠানের চারটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম “National Research Centre, Egypt”. তাদের চারটি ক্যান্ডিডেটের ধরনের নাম হলো–

DNA plasmid vaccine S,S1,S2,RBD &N,
Inactivated whole virus,
Influenza A H1N1 vector,
Protein Subunit S,N,M&S1 protein.

এগারো পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টের প্রতিটি পৃষ্ঠায় উপরে উল্লিখিত ডিসক্লেইমারটি ব্যবহার করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এর অর্থ হলো- এখানে যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কে কে কোন টাইপ নিয়ে কাজ করছে, তার লিস্ট দেয়া হয়েছে শুধু।

এটা প্রমাণ করেনা যে, এই ভ্যাক্সিনগুলো নিয়ে হু কোনো আশা দেখে বা এগুলো ভবিষ্যতে প্রয়োগ করা যাবে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, গ্লোব বায়োটেকের ব্যানকোভিডকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ল্যান্ডস্ক্যাপে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।

যেখানে জানানো হয় বিশ্বে করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে কোন কোন দেশের কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করা কোম্পানির তথ্য তালিকাভুক্ত করা, এখানে কোনও অনুমোদন বা স্বীকৃতির বিষয় নেই।

তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফায়েড ভ্যাকসিনের তালিকা, ভ্যাকসিনের তালিকা, অনুমোদিত ভ্যাকসিনের তালিকা এবং ল্যান্ডস্কেপ-এই ধাপগুলো রয়েছে। গ্লোবের ভ্যাকসিন কেবলমাত্র ল্যান্ডস্কেপে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

এ ব্যাপারে ডা: রুমি আহমেদ এর স্ট্যাটাস সংযুক্ত করা হলো।

ডাঃ রুমি আহমেদ এর স্ট্যাটাস

এ থেকে বোঝা যায়, এই ভ্যাক্সিন হু কোনো স্বীকৃতি বা লাইসেন্স দেয়নি। এ সম্পর্কে গ্লোব কতৃপক্ষ সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করেছে।

মূল ব্যাপারটাকে সহজভাবে বলা যায়-

ক্লাসের স্যার পরদিন করে আনার জন্য সবাইকে একটা এসাইনমেন্ট দিলেন।

পরদিন ক্লাসে দেখা গেলো কেউই এসাইনমেন্ট পুরো করতে পারেনি। আবার অনেকে একটুও করেনি।

তাই স্যার কে কতটুকু করলো সেটার একটা লিস্ট করে রেখে দিতে এসিস্ট্যান্টকে নির্দেশ দিলেন, যাতে পরেরদিন সহজেই বুঝতে পারেন কে কোনদিকে এগিয়েছে।

এই লিস্ট টা শুধুমাত্র অংশগ্রহণ নিয়ে করা, এসাইনমেন্টটা ঠিকঠাক হলো কিনা, তা কিন্তু স্যার এখনো দেখেননি!  যেকাজটা এখানে WHO এসিস্ট্যান্ট এর কাজটা করেছে শুধুমাত্র লিস্ট করে।এদের মধ্যে যাদের কাজ শেষ হবে, তাদের খাতা স্যারের কাছে যাবে – যেটা এই ক্ষেত্রে হবে পিয়ার রিভিউ। সেখানে পাশ করলে তবেই সেটা হবে স্বীকৃতি। যেটা WHO নিজে করবেনা। এ কাজ করবে এসাইনমেন্ট এর স্যার কিংবা পিয়ার রিভিউয়ার।

বোঝা গেলো?

দেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা চাই গ্লোব এগিয়ে যাক। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে তারা যেভাবে দেশবাসীকে ভুলভাল তথ্য ও সংবাদ দিচ্ছে, তাতে বরং তাদের কাজ নিয়ে গবেষক মহলে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে।

দেশীয় গবেষণা সংস্কৃতির উন্নয়নে গ্লোবের কাছ থেকে আরো প্রফেশনাল আচরণ আশা করছি।

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *