৮ম শ্রেণীর ছাত্রের সার্চ ইঞ্জিন বানানো নিয়ে বিভ্রান্তি

ফেসবুকে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো ভাইরাল হওয়া “অষ্টম শ্রেণীর” এই ছাত্রটি নাকি একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেছে! এড্রেস: SearchBD.net

এবং একারনে তাকে প্রসাশনের পক্ষ থেকে “২ লক্ষ টাকা” অনুদানও দেয়া হয়েছে..আর আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার “সময় টিভি” এটাকে হেডলাইন করেছে – ‘সার্চ ইঞ্জিন বানিয়ে তাক লাগালো “অষ্টম শ্রেণীর” ছাত্র’ হিসেবে! 😱

প্রথমেই বলি এই ছেলেটার প্রতি আমার নূন্যতম ইতিবাচকতা কাজ করতেছেনা একারনে যে, এই ছেলেটা বলতে গেলে মিথ্যাচার করছে।

সে আসলে যে কাজটা করেছে সেটা খুবই সামান্য একটা কাজ এবং ব্যাসিক ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারা যে কেউই এটা কয়েকঘন্টার মধ্যেই তৈরি করে ফেলতে পারবে।

আসলে এই ছেলেটা কোনো সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেনি। সে গুগলের “সার্চ ইঞ্জিন এপিআই” ব্যহারের করে জাস্ট ব্যসিক HTML,CSS ব্যবহার করে একটা সার্চ ইঞ্জিনের মতো হোমপেজ তৈরি করেছে (যেটার কোডও গুগল করলে নিমিষের মধ্যেই পাওয়া যায়) এবং এটাকেই সে প্রচার করছে এ বলে যে, সে একটা সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেছে!

গুগলের এই সার্চ ইঞ্জিন এপিআই ব্যবহার করে যে কেউ এমন সার্চ ইঞ্জিন কয়েক ঘন্টায় বানাতে পারবে। এটা আসলে কোনো সার্চ ইঞ্জিনই না।

মূলত এই সাইট টা (সার্চবিডি ডট নেট) যেটা করে সেটা হলো, এটার সার্চ বক্সে আপনি যা সার্চ করেন সেটা সে গুগলে সার্চ করে এনে আপনার সামনে গুগলের সার্চ রেজাল্ট টাই শো করে। ব্যাস..এতটুকুই!

সার্চ ইঞ্জিন শুধুমাত্র একটা পেইজ না, এটি অনেক ডাটার সম্মিলন। যারা SEO, Index, Console, Adsense ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে তারা জানে গুগল কিভাবে কাজ করে, কিভাবে লক্ষ লক্ষ ওয়েবসাইট সামনে নিয়ে আসে।

ধরুন, আপনি একটা ডোমেইন কিনলেন, ওয়েবসাইট বানালেন। সেই ওয়েবসাইট সাথে সাথে গুগলে পাবেন? না।

সেই ওয়েবসাইটে যথাযথ কনটেন্ট দিয়ে Google Search Console এ যথাযথ নিয়ম মেনে ইনডেক্স করতে হয়, এরপর গুগল সেটা এপ্রুভ করে।

এরপর গুগলে আপনি যে “কি-ওয়ার্ড” দিয়ে সার্চ করেন সেটার উপর ভিত্তি করে গুগল লক্ষ লক্ষ ওয়েবসাইট যাচাই-বাছাই করে সামনে শো করে।

একটি সার্চ ইঞ্জিন বানানো বেশ কঠিন কাজ এবং ব্যয়সাপেক্ষ। আমাদের দেশের একমাত্র সার্চ ইঞ্জিন “পিপীলিকা”কে টিকিয়ে রাখতে সাস্টে অসংখ্য শিক্ষার্থী এলগরিদম এর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

এর জন্য পুরা একটি সেন্টার, মিনি সুপার কম্পিউটার থাকার পরও পিপীলিকা তেমন এস্টাবলিশড সার্চ ইঞ্জিন না।

সমস্যা আসলে এটা না যে, সে এমন একটা সাইট বানিয়ে মিথ্যা বলছে। সমস্যা হলো :-

(০১) আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় কেনো এই খবরটা এভাবে প্রকাশ করা হলো? এই ছেলে আসলে কি করেছে সেটা যাচাই করার জন্য কিংবা সেটা বুঝার মতো একটা লোকও কি মিডিয়ায় ছিলো না!

এখানে তাক লাগানোর মতো আছে টা কি আসলে? কেনো এই অতি সামান্য জিনিসটাকে এভাবে প্রচার করা হলো?

কারনটা কি এটাই যে, “অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করে তাক লাগিয়েছে” এই হেডলাইনটা অনেক চটকদার, রঙচঙে? পাবলিক খাবে বেশী…? তাই-ই যদি হয় তাহলে আপনারা নিজেদের মিডিয়া বলেন কোন হিসেবে? আপনারা তো সন্দেহাতীত ভাবেই বাটপার।

(০২) সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আসলে বলার কিছুই নেই 🙂 এই ছেলেকে ২ লক্ষ টাকা অনুদান দেবার আগে, তারা টাকাটা কিসের জন্য দিচ্ছে সেটা একটাবার জানার কিংবা যাচাই করার প্রয়োজনবোধ কি কেউই করেনি?

যাচাই করার মতো কি কেউই ছিলো না? নাকি তারাও সময় টিভির মতো মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার চটকদার হেডলাইন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই অনুদান দিয়েছে?

শাহজাদপুর সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া এ শিক্ষার্থীকে সরকার এ অনুদান বরাদ্দ দিয়েছে। আবিরের নামে ২ লাখ টাকার চেক দিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।

– – –
এখন আসা যাক, এই ছেলেকে অনুদান দিছে, সবাই বাহবা দিচ্ছে, ছেলেটা ভাইরাল হয়েছে, তাতে সমস্যা কোথায়?

প্রথমত, এই ছেলেটার দোষ আমি কখনই দিবো না। এত ছোট বয়সে সে এমন এপিআই নিয়ে ছোটো-ছোটো এক্সপেরিমেন্ট করবে, রেডিমেড কোড নিয়ে মডিফাই করবে এটাই স্বাভাবিক।

ইভেন প্রত্যেক গ্রোন-আপ ডেভেলপারদের শুরুটা এভাবেই হয়েছে।

কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে আসলে মিথ্যাচারে। তার থেকেও বড় সমস্যা হচ্ছে চটকদার কিছু নিয়ে লাফালাফি আর প্রচুর আগ্রহ-তে; যার কারনে এই সমাজে যারা সত্যিকার অর্থে কাজ করেন এবং যারা সত্যি সত্যিই অনেক কষ্ট করে কোনো কিছু তৈরি করেন, যারা ট্রুলিই ডিজার্ভ পাবার যোগ্য তারা আসলে তাদের প্রাপ্য মূল্যায়নটা কখনোই পান না।

চিন্তা করুন, “কয়েকজন গ্রোন-আপ ডেভেলপার এবং প্রোগ্রামার মিলে কিংবা একটা কোম্পানির প্রচেষ্টায় দেশে একটা ছোটো-খাটো অরিজিনাল সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হয়েছে” এটা “অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করে সবাইকে তাক লাগালো” এই খবরের তুলনায় অনেক কম চটকদার শোনায়। 🙂

পাবলিকের কাছে মনে হয় এ আর এমন কি..একটা কোম্পানি বানাতেই পারে এমন কিছু! তখন আর সেখানে সো কল চটকদারিতা থাকেনা..

ফলাফল, সেই টিম কিংবা কোম্পানিটা যারা এতটা কষ্ট করে কাজটা করলো তারা আসলে তাদের কাজটার জন্য কোনো মূল্যায়ন পায় না..আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কাছে সেটা চটকদার না হওয়ায়, তারাও সেটা প্রচার করেনা, সে খবর ভাইরালও হয়না এবং আমাদের প্রশাসনের লোকজনের নজরেও সেটা আর যায়না, কিংবা গেলেও প্রসাশন সেটাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয় না, কারন এখানে প্রচার কই? পাবলিকের লাফালাফি কই? 🙂

একারনেই আমাদের দেশে ‘পিপীলিকা’র মতো অরিজিনাল সার্চ ইঞ্জিন ভাত পায়না, কষ্ট করে তৈরি করা ভালো ভালো প্রজেক্ট গুলা শুধুমাত্র প্রোপার সাপোর্টের অভাবেই হারিয়ে হয়ে যায়…🙂🙂🙂

একজন প্রযুক্তি-প্রেমী মানুষ হিসেবে এই ঘটনাগুলো আমাকে খুব ব্যথিত করে ভাই। খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি মানুষ ভালো কাজগুলোতে সামান্যতম সাপোর্টও দেয়না, সেগুলো নিয়ে কথা বলে না।

অথচ, চটকদার সংবাদ কিংবা মশলা মারা হেডলাইন নিয়ে নাচানাচি করে সোস্যাল মিডিয়া কাঁপায় ফেলে এবং অযোগ্যরা যোগ্যদের প্রাপ্যটা পেয়ে যায়…🙂
– – –
মেইনস্ট্রিম মিডিয়া আর প্রসাশনের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলোর অনেক বেশী দ্বায়িত্ববান এবং যোগ্য হওয়া উচিত।

পুঁথিগত বিদ্যা মুখস্ত করে এভাবে আর কতদিন দেশটা চলবে? আর আমরা পাবলিকরা.. অন্ধ বাবা/বদনা বাবা/৬ বছরের শিশু কিংবা ২ ফুট হুজুরের ওয়াজ নিয়ে লাফালাফি করাটা আমাদের জাতির ডিএনএ-তে মিশে গেছে।

আসুন এটা থেকে বের হয়ে আসি। যারা যোগ্য তাদের নিয়ে কথা বলি, তাদেরকে নূন্যতম সাপোর্ট টা দিই..চটকদার কিছুতে না বুঝে লাফানো বন্ধ করি। 🙂

যোগ্যরা ভাত এবং সাপোর্ট পাক…

লেখকঃ আরিফুজ্জামান রিপন

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *