মঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে নাসা’র রোভার Perseverance!

বাংলাদেশ সময় বেলা ১১ টা ৫০ মিনিট থেকে space.com এর ওয়েবসাইটে লাইভ দেখা যাবে।

আর মাত্র কয়েক ঘন্টা!

মার্স ২০২০ নাসার মার্স এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রামের একটি মার্স রোভার মিশন যার মধ্যে রয়েছে পার্সিভারেন্স রোভার এবং ইনজিনিটি হেলিকপ্টার ড্রোন।

৩০ জুলাই ২০২০এ ১১:৫০ ইউটিসি-তে এ মিশন চালু হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ এ মঙ্গল গ্রহের জেজেরো ক্রেটারে (মঙ্গলের একটি গর্ত) স্পর্শ করবে।

মূলত এ সময়টায় পৃথিবী এবং মঙ্গল সুবিধাজনক স্থানে থাকে এবং অভিযানে ব্যায়ও কম আসে।

মার্স ২০২০ খুঁটিনাটি :

শুরুর তারিখ : ৩০ জুলাই, ২০২০ (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫ টা ৪০)
রকেট : অ্যাটলাস ভি (AV-088)
মহাকাশযান : পার্সিভারেন্স ; ইনজিনিটি
লঞ্চ সাইট : কেপ ক্যানাভেরাল এয়ারফোর্স স্টেশন (সিসিএফএস) স্পেস লঞ্চ কমপ্লেক্স ৪১, ফ্লোরিডা
মিশনের ধরণ : এক্সপ্লোরেশন অব মার্স
অপারেটর : নাসা, জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি
সময়কাল : ১ মঙ্গলবর্ষ ( পৃথিবীর ৬৮৭ দিন)
কন্ট্রাক্টর : ইউনাইটেড লঞ্চ এলায়েন্স
ল্যান্ডিং সাইট : জেজেরো ক্রেটার, মঙ্গল
ল্যান্ডিং ডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১
রোভারের ওজন : ২৩০০ পাউন্ড (১০০০ কি.গ্রা.)

উদ্দেশ্য :

পার্সিভারেন্স রোভারের চারটি বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য রয়েছে যা প্রোগ্রামটির বিজ্ঞানের লক্ষ্যগুলিকে সমর্থন করে:

অভ্যাসযোগ্যতার সন্ধান : মাইক্রোবিয়াল জীবনকে লালন করতে সক্ষম অতীতের পরিবেশ শনাক্ত করা।

বায়োসিগন্যাচারগুলোর সন্ধান করা : সে আবাস উপযোগী পরিবেশে সম্ভাবনাময় অতীত জীবনের লক্ষণগুলি খোঁজা যেগুলো বিশেষ পাথরে সংরক্ষিত অবস্থায় থাকতে পারে।

ক্যাচিং নমুনা: মঙ্গল কোরের শিলা এবং “মাটির” নমুনাগুলি সংগ্রহ করা এবং সেগুলি মঙ্গল পৃষ্ঠের উপরে সংরক্ষণ করা।

মানুষের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ : মার্শিয়ান বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন উৎপাদন পরীক্ষা করা।

এ উদ্দেশ্যের সবই জীবনধারণের উপযুক্ততার হিসেবে মঙ্গল গ্রহের সম্ভাবনার সাথে সম্পর্কিত। প্রথম তিনটি অতীতের মাইক্রোবিয়াল জীবনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে।

এমনকি রোভারটি পাস্ট মাইক্রোবিয়াল লাইফের কোনো লক্ষণ যদি আবিষ্কার করতে নাও পারে তবুও এটি ভবিষ্যৎ মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের পথ সুগম করবে।

পার্সিভারেন্স রোভার এ চারটি উদ্দেশ্য সম্পর্কিত অন্যান্য বৈজ্ঞানিক গবেষণাও পরিচালনা করবে।

উদাহরণস্বরূপ, রোভারটি মার্শিয়ান বায়ুমণ্ডলে আবহাওয়া এবং ধূলিকণা পর্যবেক্ষণ করবে।

মঙ্গল গ্রহে দৈনিক এবং সিজনাল পরিবর্তনগুলি বোঝার জন্য এই ধরনের অবজার্ভেশন গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের মানব অভিযাত্রীকে মঙ্গলীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করবে।

মঙ্গল গ্রহকে এখন নিষ্ফলা বরফছাওয়া মরুভূমি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশীর পৃষ্ঠে কখনো কি প্রাণের অস্তিত্ব ছিল?

এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর বহু শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন। এ নিয়ে বহু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি রচিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ৪০০ কোটি বছর আগে দুটি গ্রহেই জীবন প্রতিপালনের সম্ভাবনা লক্ষ করা যায়। তবে মঙ্গলের মধ্যবর্তী ইতিহাস প্রহেলিকাময়।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মঙ্গলের রহস্য ভেদ করতে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন এই গ্রীষ্মে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করছে।

অবশ্য মঙ্গলে প্রাণের অনুসন্ধান করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে না তারা। কারণ, সেখানে এখন কিছুই টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই।

তবে অতীতের জীবনরূপের সম্ভাব্য যদি কোনো চিহ্ন সেখানে পাওয়া যায়, সেটাই অনুসন্ধান করা হবে।

এই বিশাল ও ব্যয়বহুল প্রোগ্রামগুলো বৃথা প্রমাণ করতে পারে।

তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্যান্য গ্রহে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজে পেতে লাল গ্রহটি নিয়ে এখনো আমাদের অনেক আশা।

চলতি সপ্তাহে ফ্রান্স মহাকাশ সংস্থা সিনেসের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ-ভেস লা গল বলেন,

‘ভিনগ্রহের কোনো প্রাণীর সন্ধান করতে হলে এখনো মঙ্গলই আদর্শ জায়গা। কারণ, এটি কয়েক শ কোটি বছর আগে বাসযোগ্য ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসার ২০২০ সালে মঙ্গল পর্যবেক্ষণ অভিযান জুলাই মাসের শেষ দিকে অর্থাৎ ৩০ জুলাই শুরু হচ্ছে।

ওই সময় মঙ্গল গ্রহ ও পৃথিবী দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করবে।

২৫০ কোটি ডলার খরচ করে সবচেয়ে আধুনিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মঙ্গলের রহস্য উন্মোচনের এটাই বৃহত্তম প্রচেষ্টা।

তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়; মহাকাশ অভিযান নিয়ে আগ্রহ আবার বাড়তে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে।

সপ্তদশ শতকে মঙ্গল নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ শুরু হয়।

১৬০৯ সালে ইতালির বিজ্ঞানী গ্যালিলিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মঙ্গল পর্যবেক্ষণ করেন, যা জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার হিসেবে গণ্য করা হয়।

এর ৫০ বছর পর ডাচ্‌ বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হিউজেনস আরও উন্নত টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মঙ্গলের টপোলজিক্যাল নকশা আঁকেন।

এ শতকের ষাটের দশকে এসে বিজ্ঞানীরা বলেন, মঙ্গল গ্রহ প্রাণ ধারণের অনুপযোগী।

গবেষকেদের ধারণা সত্যি হয়, যখন সেখানে ভাইকিং ল্যান্ডারস মঙ্গলের মাটি পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়।

মঙ্গল নিয়ে আগ্রহ ২০ বছরের জন্য শেষ হয়ে যায়। ২০১১ সালে এসে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের পানি থাকার প্রমাণ পান।

পানি পাওয়ার পর থেকেই মঙ্গল ঘিরে আবার আগ্রহ জন্মাতে শুরু করে।

ফ্রান্সের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার বিজ্ঞানী মাইকেল ভিসো বলেন, পানির সন্ধান পাওয়ার পর থেকে প্রতিটি অভিযানেই মঙ্গল যে একেবারে মৃত নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

‘প্রিজারভেন্স’ নামের নতুন যে মার্কিন নভোযান মঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে যাচ্ছে, তা ছয় মাসের যাত্রা শেষে ফেব্রুয়ারিতে মঙ্গলে অবতরণ করবে।

এটি মঙ্গলে জেজেরো ক্রেটার নামে একটি অঞ্চলে নামবে, যা ৪৫ কিলোমিটার নদীর বদ্বীপ।

সেখানে পৃথিবীর মতো পলল শিলা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আগামী এক দশক ধরে মঙ্গলে প্রাণের অনুসন্ধান করবেন।

মঙ্গলে যদি প্রাণের অস্তিত্ব না মেলে, তবে তাঁরা চোখ রাখবেন শনি ও বৃহস্পতিবার চাঁদের দিকে।

তবে সেখানে পৌঁছানোর বিষয়টি এখনো বাস্তবতার চেয়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতেই রয়ে গেছে।

মার্স ২০২০ এ প্রযুক্তি :

মার্স ২০২০ ল্যান্ডিং সিস্টেমে একটা প্যারাস্যুট, একটা ডিসেন্ট ভেহিকল, অবতরণের আগে চূড়ান্ত সময়ে একটি টিথারে রোভারটি নামানোর জন্য “স্কাইক্রেন ম্যানুয়েভার” আছে।

এ ল্যান্ডিং সিস্টেম মঙ্গলের পৃষ্ঠে খুব বড় এবং ভারী রোভার ল্যান্ডিং-এর দিক দিয়ে আগের তুলনায় অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন এবং নিঁখুত ল্যান্ডিং এর সম্ভাবনা বেশি।

এ মিশনে টেরেইন রিলেটিভ নেভিগেশন (TRN) সিস্টেম আছে যা মঙ্গলীয় বায়ুমন্ডলের মধ্যে দিয়ে নেমে যাওয়ার সময় চারপাশে ঘুরিয়ে বিপদজনক অঞ্চল শনাক্ত ও এড়িয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

এছাড়া মাইক্রোফোন সিস্টেমের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ারগণ রোভারের প্রবেশ, উড্ডয়ণ এবং অবতরণের বিশ্লেষণ করতে পারেন।

এটা কাজের সময় রোভারের সাউন্ড ক্যাপচার করতে পারে যা ইঞ্জিনিয়ারদের রোভারের অবস্থা কেমন এবং এর অপারেশন সম্পর্কে ক্লু সরবরাহ করে।

পার্সিভারেন্স রোভার ডিজাইন অনেকটা কিউরিওসিটি রোভার ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছে যা এ মিশনের খরচ অনেকটাই বাঁচিয়ে দিয়েছে এবং এটা প্রমাণিত এবং পরীক্ষিত ডিজাইন।

রোভারটির লং রেঞ্জ মবিলিটি সিস্টেম এটাকে ৩ – ১২ মাইল (৫-২০ কি.মি.) দূরত্ব পর্যন্ত মার্সের তলদেশে চালাতে সক্ষম!

পার্সিভারেন্স রোভারের চাকা মার্সের সার্ফেসের ওপর ভিত্তি করে নতুন ভাবে ডিজাইন করে সক্ষম করে তোলা হয়েছে।

রোভারটি মার্শিয়ান শিলা এবং মাটি থেকে নমুনাগুলি শনাক্তের জন্য একটি ড্রিল বহন করে যা এই প্রথমবার ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি “ডিপো ক্যাচিং” নামে একটি কৌশল ব্যবহার করে মঙ্গল পৃষ্ঠের টিউবগুলি থেকে কোর সংগ্রহ করে এবং সঞ্চয় করে। নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি মঙ্গল অভিযানে একটি নতুন সক্ষমতা!

এটা ভবিষ্যত মিশনগুলোর জন্যে একটা পথ তৈরি করে দিতে পারে যার মাধ্যমে বিভিন্ন নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসা যাবে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ করা যাবে।

পার্সিভারেন্স রোভারে মঙ্গলের বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড (মার্সের বায়ুমন্ডলের ৯৬% কার্বন ডাই-অক্সাইড) সংগ্রহ করার প্রযুক্তি আছে যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানববসতি স্থাপনের প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে।

এ নতুন প্রযুক্তি মার্সের প্রাকৃতিক রিসোর্স ব্যবহার করে কিংবা ডিজাইন উন্নত করার মাধ্যমে মানুষের বসবাস, যাতায়াত, কাজকর্মের উপযোগী করে তোলার জন্য পদ্ধতি প্রণয়নে মিশন প্ল্যানারদের সাহায্য করবে।

উল্লেখ্য, নাসা মার্স ২০২০ এর মাধ্যমে মানুষদের তাদের নাম মঙ্গলে পাঠানোর সুযোগ দিয়েছে৷

৭৫ ন্যানোমিটারের একটা সিলিকন চিপে ২ লক্ষাধিক মানুষের নাম তারা দিয়ে দেবে। এ চিপটি রোভারের ওপরে একটা গ্লাস কভারের নিচে থাকবে।

এ সম্পর্কিত ভিডিও –
https://youtu.be/5qqsMjy8Rx0

সর্বোপরি, মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনে এ মিশন ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে এবং নবযুগের সূচনা ঘটাবে।

তথ্যসূত্র :
NASA Mars 2020
https://mars.nasa.gov/mars2020/
https://mars.nasa.gov/mars2020/mission/overview/

Space News
Space.com
Prothom Alo

©KS Rahman।

 

এ মাসেই হতে পারে চীনের “তিয়ানওয়েন-১” মার্স প্রোবের উৎক্ষেপণ

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *